আজিজ যেভাবে খুনী ভাইদের রক্ষা করেছিলেন
নিজস্ব প্রতিবেদক: Kanak Sarwarপ্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ২৩ মে, ২০২৪
সেনাবাহিনীর প্রধান হিসেবে লেফটেন্যান্ট জেনারেল আজিজ আহমেদ দায়িত্ব গ্রহণ করেছিলেন ২০১৮ সালের ২৫ জুন। ২০২১ সালের ২৩ জুন পর্যন্ত সময়ে তিনি সেনাপ্রধানের দায়িত্বে ছিলেন।
দুর্নীতিতে সম্পৃক্ততার অভিযোগে গতকাল সোমবার সাবেক সেনাপ্রধান জেনারেল (অব.) আজিজ আহমেদের ওপর নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। এর ফলে আজিজ আহমেদ ও তার পরিবারের সদস্যরা যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশে অযোগ্য হয়েছেন।
যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর বলেছে, আজিজ আহমেদ তার ভাইকে বাংলাদেশে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের জন্য জবাবদিহি এড়াতে সহযোগিতা করেন। এটা করতে গিয়ে তিনি নিয়মতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় হস্তক্ষেপের মাধ্যমে উল্লেখযোগ্য দুর্নীতিতে জড়িয়েছেন। এ ছাড়া অন্যায্যভাবে সামরিক খাতে কন্ট্রাক্ট পাওয়া নিশ্চিত করার জন্য তিনি তার ভাইয়ের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করেছেন। তিনি নিজের স্বার্থের জন্য সরকারি নিয়োগের বিনিময়ে ঘুষ নিয়েছেন।

সেনাপ্রধান থাকাকালীন সময়েই আজিজ আহমেদের এ সব কর্মকাণ্ড নিয়ে প্রথম আলোসহ দেশ–বিদেশের বিভিন্ন গণমাধ্যমে অসংখ্য সংবাদ ছাপা হয়েছিল। কিন্তু সরকারের পক্ষ থেকে কোনো ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
সন্ত্রাসী জোসেফের সাজা মওকুফের আবেদন থেকে শুরু করে দেশত্যাগ পর্যন্ত অসংখ্য সংবাদ প্রকাশ করেছে প্রথম আলো। খুনের দুই মামলা: হারিছ, আনিসের সাজাও মাফ করেছে সরকার–শিরোনামে সংবাদটি ছাপা হয়েছিল ২০২১ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি।
বহুল আলোচিত দুই সহোদর হারিছ আহমেদ ও আনিস আহমেদের সাজা মওকুফ করেছে সরকার। হারিছ দুটি এবং আনিস একটি খুনের মামলায় যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত আসামি ছিলেন। ২০১৯ সালের ২৮ মার্চ তাদের সাজা মওকুফের প্রজ্ঞাপন জারি করেছিল স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।
কাতার ভিত্তিক টেলিভিশন চ্যানেল আল–জাজিরায় প্রচারিত অল দ্য প্রাইম মিনিস্টারস মেন তথ্যচিত্রে এই দুই ভাইকে পলাতক আসামি হিসেবে উল্লেখ করা হয়। বাংলাদেশেও গতকাল পর্যন্ত সবাই জানত তারা সাজাপ্রাপ্ত পলাতক আসামি। তবে প্রথম আলোর অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে সম্পূর্ণ ভিন্ন তথ্য।
জার্মানভিত্তিক সংবাদমাধ্যম ডয়চে ভেলে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর আন্তর্জাতিক সম্পর্কবিষয়ক উপদেষ্টা গওহর রিজভীকে তাদের টক শো কনফ্লিক্ট জোনে আমন্ত্রণ জানায়। সেখানে এই দুই পলাতক সহোদরের বাংলাদেশে প্রকাশ্য অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণসহ নানা বিষয় উঠে আসে।
হারিছ আহমেদ ও আনিস আহমেদ সেনাবাহিনীর প্রধান জেনারেল আজিজ আহমেদের ভাই। তাদের আরেক ভাই তোফায়েল আহমেদ ওরফে জোসেফও খুনের মামলায় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি ছিলেন। রাষ্ট্রপতির বিশেষ ক্ষমায় কারামুক্ত হন তিনি। জোসেফের সাজা মাফ করার জন্য আবেদন করেছিলেন তার মা রেনুজা বেগম। হারিছ ও আনিসের জন্য কে, কখন, কীভাবে আবেদন করেছেন, সে তথ্য এখনো পরিষ্কার হয়নি। জেনারেল আজিজ আহমেদের আরেক ছোট ভাই টিপু আহমেদ ১৯৯৯ সালে প্রতিপক্ষের হাতে খুন হয়েছিলেন।

জেনারেল আজিজ আহমেদ ২০১৮ সালের ২৫ জুন সেনাপ্রধান নিযুক্ত হন। এর এক মাস আগে ২০১৮ সালের ২৭ মে সাজা মওকুফের পর ছাড়া পান জোসেফ। আর ৯ মাস পর হারিছ আহমেদ ও আনিস আহমেদের সাজা মওকুফের প্রজ্ঞাপন জারি হয়। হারিছ আহমেদ ও আনিস আহমেদের যাবজ্জীবন সাজা মাফ করা হয়েছে ফৌজদারি কার্যবিধির ৪০১ ধারার ক্ষমতাবলে। ফৌজদারি কার্যবিধির ৪০১(১) উপধারায় বলা হয়েছে, কোনো ব্যক্তি কোনো অপরাধের জন্য দণ্ডিত হলে সরকার যেকোনো সময় বিনা শর্তে বা দণ্ডিত ব্যক্তি যে শর্ত মেনে নেয়, সেই শর্তে তার দণ্ডের কার্যকারিতা স্থগিত বা সম্পূর্ণ দণ্ড বা দণ্ডের অংশবিশেষ মওকুফ করতে পারে।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সূত্র জানায়, যেদিন মন্ত্রণালয় থেকে সাজা মওকুফের প্রজ্ঞাপন জারি হয়, সেদিনই ঢাকার পৃথক দুটি দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে তার অনুলিপি পাঠানো হয়। এই দুটি বিচারিক আদালত আসামিদের সাজা দিয়েছিলেন। আদালত–সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, প্রজ্ঞাপন পাওয়ার পর হারিছ আহমেদ ও আনিস আহমেদের নামে থাকা গ্রেপ্তারি পরোয়ানা বিনা তামিলে ফেরত পাঠানোর জন্য মোহাম্মদপুর ও কোতোয়ালি থানাকে আদেশ দেন আদালত।
প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার হয়ে ষড়যন্ত্রমূলক, পরিকল্পিত, সাজানো ও বানোয়াট মামলায় যাবজ্জীবন দণ্ডপ্রাপ্ত হারিছ আহমেদ ও আনিস আহমেদের যাবজ্জীবন সাজা ও অর্থদণ্ড ফৌজদারি কার্যবিধির ৪০১ ধারার ক্ষমতাবলে মওকুফ করা হয়েছে।
এই প্রজ্ঞাপনের অনুলিপি তখন প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখ্য সচিব, আইনসচিব, পুলিশের মহাপরিদর্শক, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর একান্ত সচিব, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সুরক্ষাসেবা বিভাগের সচিবকে পাঠানো হয়। পাশাপাশি আসামি হারিছ আহমেদ, আনিস আহমেদ ও তাদের মা রেনুজা বেগমকেও প্রজ্ঞাপনের অনুলিপি পাঠানো হয় বলে জানা গেছে। সরকারের এতগুলো দপ্তরে প্রায় দুই বছর আগে এই প্রজ্ঞাপনের অনুলিপি গেলেও এত দিন তা গোপন ছিল।
সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী শাহদীন মালিক বলেন, পলাতক কোনো ব্যক্তি কখনো কোনো ধরনের আইনি সুযোগ-সুবিধা এবং অধিকার ভোগ করতে পারে না। ফৌজদারি কার্যবিধির ৪০১ ধারায় পলাতক কারও সাজা মওকুফ করা হলে তা সম্পূর্ণ বেআইনি হবে। এটা আইনের স্পষ্ট বিধান। তিনি বলেন, যদি কেউ এই আইনের বিধান লঙ্ঘন করে সাজা মওকুফের ব্যবস্থা করেন, তাহলে তার বা তাদের বিরুদ্ধেও আইন অনুযায়ী বিভাগীয় ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া যায়। কারণ, পলাতক আসামির দণ্ড মওকুফ করার অর্থ ক্ষমতার বেআইনি ব্যবহার ও অপপ্রয়োগ।
তবে আইনমন্ত্রী আনিসুল হক বলেন, ফৌজদারি কার্যবিধির ৪০১ ধারায় সাজা মওকুফের জন্য কোনো আসামিকে উপস্থিত থাকতে হবে, এমন কোনো বাধ্যবাধকতা নেই।
গতকাল সোমবার সন্ধ্যায় বাংলাদেশ পুলিশের ওয়েবসাইটে গিয়ে দেখা গেছে, ‘ওয়ান্টেড (পলাতক)’ আসামির তালিকায় হারিছ আহমেদের নাম আছে।
মোস্তাফিজ খুনের দায়ে সাজা পান হারিছ, আনিস ও জোসেফ
মোহাম্মদপুরের ব্যবসায়ী মোস্তাফিজুর রহমানকে ১৯৯৬ সালের ৭ মে গুলি করে হত্যা করা হয়। এ ঘটনায় দায়ের করা মামলায় হারিছ আহমেদ, আনিছ আহমেদ, তোফায়েল আহমেদ ওরফে জোসেফসহ ছয়জনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দেয় পুলিশ। ২০০৪ সালের ২৫ মে ঢাকার দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল-৩ মামলার রায় ঘোষণা করেন। রায়ে জোসেফ ও মাসুদ নামের এক আসামিকে মৃত্যুদণ্ড দেন আদালত। আর পলাতক আসামি হারিছ আহমেদ, আনিস আহমেদসহ তিনজনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়।
মামলার নথি অনুযায়ী, বিচারিক আদালতের এই রায়ের বিরুদ্ধে কারাগারে থাকা জোসেফ হাইকোর্টে আপিল করেন। হারিছ আহমেদ ও আনিস আহমেদ পলাতক থাকায় তারা আপিলের সুযোগ পাননি। অবশ্য ডেথ রেফারেন্স ও আসামিদের আপিলের শুনানি শেষে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়ে ২০০৭ সালের ২০ সেপ্টেম্বর হাইকোর্ট রায় দেন। রায়ে তোফায়েল আহমেদ জোসেফ ও আরেক আসামি কাবিলের সাজা বহাল রাখা হয়। কিন্তু মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি মাসুদ খালাস পান।
হাইকোর্টের ওই রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করেন জোসেফ ও কাবিল। বর্তমান সরকারের সময় ২০১৫ সালের ৯ ডিসেম্বর রায় দেন আপিল বিভাগ। তাতে জোসেফের সাজা কমিয়ে মৃত্যুদণ্ড থেকে যাবজ্জীবন করা হয়। আর খালাস পান কাবিল। পরের বছর ২০১৬ সালে জোসেফের পক্ষ থেকে তার মা সাজা মওকুফ চেয়ে রাষ্ট্রপতির কাছে আবেদন করেন। ২০১৮ সালে রাষ্ট্রপতি জোসেফের সাজা মওকুফ করে দেন এবং তিনি কারাগার থেকে মুক্তি পান। এই মামলায়ই ২০১৯ সালের ২৮ মার্চ হারিছ আহমেদ ও আনিছ আহমেদের সাজা মওকুফ করে সরকার প্রজ্ঞাপন জারি করে।
আবু মোরশেদ খুনের দায়ে হারিছ ও জোসেফের সাজা
১৯৯৫ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর ঢাকার জজকোর্ট প্রাঙ্গণে হামলার শিকার হন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র আবু মোরশেদ। তিনি ছাত্রদল কর্মী ছিলেন। ঘটনার দিন মোরশেদ একটি খুনের মামলায় হাজিরা দিতে জজকোর্টে যান। ঢাকার আইনজীবী ভবনের সামনে তাকে গুলি করা হয়। পরে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় সাত দিন পর ২ অক্টোবর তিনি মারা যান।
এ ঘটনায় মোরশেদের বাবা আইনজীবী আজিজুল্লাহ ভূঁইয়া কোতোয়ালি থানায় মামলা করেন। সেই মামলায় আওয়ামী লীগ সরকারের সময় ১৯৯৭ সালের ১১ এপ্রিল হারিছ আহমেদ, তোফায়েল আহমেদ জোসেফসহ আটজনের বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র দেয় পুলিশ। পরের বছর সম্পূরক অভিযোগপত্রে আরও দুজনকে আসামি করা হয়। ১৯৯৯ সালের ৪ অক্টোবর ১০ আসামির বিচার শুরু হয়। ২০০৩ সালের ১০ আগস্ট মামলাটি বিচারের জন্য ঢাকার দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল-৪–এ পাঠানো হয়।
নথিপত্রে দেখা যায়, শুনানিতে আত্মপক্ষ সমর্থনের সময় আসামিপক্ষ দাবি করে, নিহত মোরশেদ মোহাম্মদপুরের বাবু খুনের মামলার আসামি। একই মামলায় জোসেফসহ অন্যরা সাক্ষী ছিলেন। শত্রুতা করে তাদের মোরশেদ খুনের মামলায় জড়ানো হয়েছে।
তবে ১৯৯৫ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর চিকিৎসাধীন অবস্থায় ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে মৃত্যুকালীন জবানবন্দি দেন মোরশেদ। তাতে তিনি বলেন, ঢাকা আইনজীবী সমিতির বাইরের গেটে হারিছ, মামুন, মুন্না, প্যারিস ও শাহীন তাকে ঘেরাও করেন। জোসেফ ও মামুন তাকে গুলি করেন।
২০০৪ সালের ৩ মার্চ আদালত এ মামলার রায় দেন। তাতে জোসেফ ও তারিক সাইফ ওরফে মামুনকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। হারিছ আহমেদ, ইসলাম ওরফে মুন্না, আশানুজ্জামান ওরফে প্যারিস ও শাহীনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়। খালাস পান শোহেব, তপন, বাদল ও ফারুক আহমেদ। এই মামলায় আনিস আহমেদ আসামি ছিলেন না। আদালত রায়ে বলেছেন, নিহতের মৃত্যুকালীন জবানবন্দির সাক্ষ্যগত মূল্য বিবেচনাসহ অন্য সব সাক্ষ্যপ্রমাণের ভিত্তিতে আসামির সাজা দেওয়া হয়।
এ মামলার রায়ের বিরুদ্ধেও হারিছ আহমেদ কোনো আপিল করেননি। তবে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ২০১৯ সালের ২৮ মার্চের প্রজ্ঞাপনে হারিছ আহমেদের এই মামলার সাজাও মাফ করে দেওয়া হয়।
Related News
জুলাই যোদ্ধাদের দায়মুক্তি ও আইনি সুরক্ষা দিয়ে অধ্যাদেশ জারি
জুলাই যোদ্ধাদের দায়মুক্তি ও আইনি সুরক্ষা দিয়ে অধ্যাদেশ জারি
জুলাই যোদ্ধাদের দায়মুক্তি ও আইনি সুরক্ষা রোববার (২৫ জানুয়ারি) রাতে আইন মন্ত্রণালয়ের লেজিসলেটিভ ও সংসদবিষয়ক বিভাগ থেকে আধ্যাদেশের গেজেট জারি করা হয়েছে।
গেজেটে বলা হয়েছে, জুলাই গণঅভ্যুত্থানে অংশগ্রহণের কারণে গণঅভ্যুত্থানকারীদের বিরুদ্ধে দায়ের করা সব দেওয়ানি বা ফৌজদারি মামলা, অভিযোগ বা কার্যধারা বিধান অনুযায়ী প্রত্যাহার করা হবে। এ বিষয়ে নতুন কোনো দেওয়ানি বা ফৌজদারি মামলা, অভিযোগ বা কার্যধারা গণঅভ্যুত্থানকারীদের বিরুদ্ধে দায়ের আইনত করা যাবে না বলেও অধ্যাদেশে উল্লেখ করা হয়েছে।
অধ্যাদেশে বলা হয়, ছাত্র-জনতা ২০২৪ সালের জুলাই ও আগস্ট মাসে ফ্যাসিস্ট শাসকের পতন ঘটানোর মাধ্যমে গণতন্ত্র, মানবাধিকার ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে একটি সর্বাত্মক গণঅভ্যুত্থানে অংশগ্রহণ করে, যা পরবর্তীকালে জুলাই গণঅভ্যুত্থান হিসেবে স্বীকৃতি পায়। জুলাই গণঅভ্যুত্থান চলাকালীন ফ্যাসিবাদী সরকারের নির্দেশে পরিচালিত নির্বিচার হত্যাকাণ্ড ও সশস্ত্র আক্রমণ প্রতিরোধ এবং জনশৃঙ্খলা পুনর্বহাল ও নিশ্চিত করতে আত্মরক্ষাসহ অন্যান্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ অনিবার্য হয়ে ওঠে।
এতে আরও বলা হয়, এ প্রতিরোধ কর্মে এবং জনশৃঙ্খলা পুনর্বহাল ও নিশ্চিত করার প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণকারী গণঅভ্যুত্থানকারীদের সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৪৬ অনুযায়ী সুরক্ষা দেয়া প্রয়োজন। তাই এ প্রেক্ষাপটে অধ্যাদেশটি করা হয়েছে ।অধ্যাদেশে বলা হয়েছে, কোনো গণঅভ্যুত্থানকারীর বিরুদ্ধে কোনো মামলা, অভিযোগ বা কার্যধারা জুলাই গণঅভ্যুত্থানে অংশগ্রহণ করার কারণে দায়ের করা হলে পাবলিক প্রসিকিউটর বা সরকারনিযুক্ত কোনো আইনজীবীর প্রত্যয়নের ভিত্তিতে সংশ্লিষ্ট আদালতে আবেদন দাখিল করা হবে। আবেদন দাখিলের পর আদালত এ মামলা বা কার্যধারা সম্পর্কে আর কোনো কার্যক্রম গ্রহণ করবেন না। এ মামলা প্রত্যাহার করা হয়েছে বলে গণ্য হবে এবং অভিযুক্ত ব্যক্তি অবিলম্বে অব্যাহতি বা খালাস পাবে।
অধ্যাদেশে বলা হয়েছে, কোনো গণঅভ্যুত্থানকারীর বিরুদ্ধে জুলাই গণঅভ্যুত্থানকালে হত্যাকাণ্ড সংঘটনের অভিযোগ থাকলে তা মানবাধিকার কমিশনে দাখিল করা যাবে এবং কমিশন অভিযোগ তদন্তের ব্যবস্থা গ্রহণ করবে। তবে ‘জাতীয় মানবাধিকার কমিশন অধ্যাদেশ, ২০২৫’ এ যা কিছু থাকুক না কেন, যেক্ষেত্রে হত্যাকাণ্ডের শিকার ব্যক্তি কোনো প্রতিষ্ঠান বা বাহিনীতে (পুলিশ বা অন্যান্য আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী) কর্মরত ছিলেন, সেক্ষেত্রে কমিশন ওই প্রতিষ্ঠান বা বাহিনীতে বর্তমানে বা আগে কর্মরত কোনো কর্মকর্তাকে তদন্তের দায়িত্ব দিতে পারবে না।
তদন্ত চলাকালে আসামিকে গ্রেপ্তার বা হেফাজতে নেয়ার প্রয়োজন হলে তদন্তকারী কর্মকর্তা যুক্তিসংগত কারণ উল্লেখ করে কমিশনের অনুমোদন গ্রহণ করবেন বলে অধ্যাদেশে উল্লেখ করা হয়েছে।
কমিশনের তদন্তে যদি দেখা যায়, অভিযোগটি বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে অপরাধমূলক অপব্যবহার ছিল, তাহলে কমিশন সংশ্লিষ্ট আদালতে প্রতিবেদন দেবে। আদালত সেটিকে পুলিশ প্রতিবেদন হিসেবে গণ্য করে পরবর্তী ব্যবস্থা নেবে বলে অধ্যাদেশে জানানো হয়েছে।
কমিশনের তদন্তে যদি দেখা যায়-অভিযোগে উল্লিখিত কাজ রাজনৈতিক প্রতিরোধের অংশ ছিল, সেক্ষেত্রে কমিশন উপযুক্ত মনে করলে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারকে ক্ষতিপূরণ দেয়ার সরকারকে আদেশ দিতে পারবে।
এক্ষেত্রে আদালতে কোনো মামলা করা যাবে না কিংবা অন্য কোনো আইনগত কার্যধারা গ্রহণ করা যাবে না বলেও অধ্যাদেশে জানানো হয়।
অধ্যাদেশের উদ্দেশ্য বাস্তবায়নে সরকার প্রয়োজনে বিধি প্রণয়ন করতে পারবে।
বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের ক্ষেত্রে একটি বিপজ্জনক দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে পারে-দিল্লিতে হাসিনার বক্তব্য প্রসঙ্গে ঢাকা
মানবতাবিরোধী অপরাধে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত পলাতক সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ভারতের নয়াদিল্লিতে প্রকাশ্যে একটি অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেয়ার সুযোগ দেয়ার ঘটনায় গভীর ক্ষোভ ও বিস্ময় প্রকাশ করেছে সরকার। রবিবার (২৫ জানুয়ারি) এ বিষয়ে বিবৃতি দিয়েছে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। গত ২৩ জানুয়ারি নয়াদিল্লির ওই অনুষ্ঠানে শেখ হাসিনা বাংলাদেশের সরকার উৎখাতের আহ্বান জানান এবং আসন্ন জাতীয় নির্বাচনকে ভণ্ডুল করার লক্ষ্যে সহিংসতায় উসকানিমূলক বক্তব্য দেন বলে বিবৃতিতে অভিযোগ করেছে ঢাকা। বিবৃতিতে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানায়, শেখ হাসিনা তার বক্তব্যে দলীয় অনুসারী ও সাধারণ জনগণকে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে জড়িত হতে প্রকাশ্যভাবে উসকানি দিয়েছেন। এতে বাংলাদেশের শান্তি, নিরাপত্তা ও গণতান্ত্রিক উত্তরণ মারাত্মকভাবে হুমকির মুখে পড়েছে বলে সরকার মনে করে। এতে আরও বলা হয়, দ্বিপাক্ষিক প্রত্যর্পণ চুক্তির আওতায় শেখ হাসিনাকে বাংলাদেশের কাছে হস্তান্তরের জন্য ভারতকে বারবার অনুরোধ জানানো হলেও এখনো এ বিষয়ে কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেয়া হয়নি। বরং, ভারতের মাটিতে দাঁড়িয়ে তাকে এ ধরনের উসকানিমূলক বক্তব্য দেয়ার সুযোগ দেয়া হয়েছে, যা বাংলাদেশের জনগণের অনুভূতিকে গভীরভাবে আঘাত করেছে। বাংলাদেশ সরকার মনে করে, ভারতের রাজধানীতে এ ধরনের অনুষ্ঠানের আয়োজনের অনুমতি দেয়া এবং একজন দণ্ডিত ব্যক্তিকে প্রকাশ্যে ঘৃণামূলক বক্তব্য দেয়ার সুযোগ করে দেয়া রাষ্ট্রসমূহের পারস্পরিক সম্পর্কের প্রচলিত নীতিমালা- যেমন সার্বভৌমত্বের প্রতি শ্রদ্ধা, অভ্যন্তরীণ বিষয়ে অনধিকার হস্তক্ষেপ না করা এবং সুপ্রতিবেশীসুলভ আচরণের পরিপন্থি। এটি বাংলাদেশ সরকার ও জনগণের প্রতি একটি স্পষ্ট অবমাননা বলেও বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়। বিবৃতিতে সতর্ক করে বলা হয়, এ ধরনের ঘটনা বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের ভবিষ্যতের ক্ষেত্রে একটি বিপজ্জনক দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে পারে। একইসঙ্গে এতে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নির্বাচিত সরকারগুলোর পক্ষে পারস্পরিক কল্যাণমূলক দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক গড়ে তোলা ও এগিয়ে নেয়ার সক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের নেতৃত্বের সাম্প্রতিক উসকানিমূলক বক্তব্যের প্রসঙ্গ টেনে বিবৃতিতে বাংলাদেশ সরকার জানায়, এসব কর্মকাণ্ডই প্রমাণ করে কেন অন্তর্বর্তী সরকার দলটির কার্যক্রম নিষিদ্ধ করতে বাধ্য হয়েছে। নির্বাচনের আগে ও নির্বাচন দিবসে সংঘটিত যেকোনো সহিংসতা ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের দায় সংশ্লিষ্ট সংগঠনের ওপর বর্তাবে বলেও বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়। এছাড়াও বাংলাদেশ সরকার জানিয়েছে, আসন্ন জাতীয় নির্বাচনকে কেন্দ্র করে যেকোনো ধরনের সহিংসতা ও ষড়যন্ত্র প্রতিহত করতে প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থা নেয়া হবে এবং দেশের শান্তি ও গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া রক্ষায় সরকার কঠোর অবস্থান নেবে।

আজ চট্রগ্রাম যাচ্ছেন তারেক রহমান
আলো ফোটার সঙ্গে সঙ্গে চট্টগ্রাম নগরের পলোগ্রাউন্ড মাঠে জড়ো হতে শুরু করেছেন বিএনপির নেতাকর্মীরা। রোববার (২৫ জানুয়ারি) ভোর থেকেই দলে দলে নেতাকর্মীরা মাঠে আসছেন, কেউ কেউ আবার রাত থেকেই সেখানে অবস্থান নিয়েছেন। দীর্ঘ প্রায় দুই দশক পর বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানের চট্টগ্রাম সফর ও মহাসমাবেশকে কেন্দ্র করে নেতাকর্মীদের মধ্যে ব্যাপক উৎসাহ ও উদ্দীপনা লক্ষ্য করা গেছে। সমাবেশস্থল ও আশপাশের এলাকা ব্যানার-ফেস্টুনে সাজানো হয়েছে। সন্ধ্যা ৭টা ২০ মিনিটে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের ফ্লাইট বিজি-১৪৭ যোগে তারেক রহমান শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণ করেন। সেখান থেকে সরাসরি নগরের পাঁচ তারকা হোটেল রেডিসন ব্লুতে যান এবং সেখানে রাতযাপন করেন। দলীয় সূত্র জানায়, রোববার সকাল সাড়ে ৯টায় তিনি তরুণদের সঙ্গে একটি পলিসি ডায়ালগে অংশ নেবেন। এরপর বেলা সাড়ে ১১টায় পলোগ্রাউন্ড মাঠের মহাসমাবেশে যোগ দেবেন। চট্টগ্রাম সফর শেষে তিনি ফেনী, কুমিল্লা ও নারায়ণগঞ্জে একাধিক পথসভায় অংশ নেওয়ার কথা রয়েছে। মহাসমাবেশকে ঘিরে চট্টগ্রাম নগরীতে নেওয়া হয়েছে কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা। প্রায় দুই হাজার পুলিশ সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। মঞ্চসহ পুরো এলাকাকে তিন স্তরের নিরাপত্তা বলয়ে ভাগ করা হয়েছে—রেড জোন, ইয়েলো জোন ও গ্রিন জোন। মঞ্চ এলাকা রেড জোন হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে, যেখানে কেবল কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দ ও সংশ্লিষ্ট আসনের প্রার্থীরা অবস্থান করতে পারবেন। উল্লেখ্য, সর্বশেষ ২০০৫ সালে চট্টগ্রাম সফরে গিয়ে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনের প্রচারণায় লালদিঘী ময়দানে জনসভায় বক্তব্য দিয়েছিলেন তারেক রহমান।

বাংলাদেশ কে বিশ্বকাপ থেকে বাদ দেওয়ায় পাকিস্তানি ক্রিকেটার আফ্রিদির ক্ষোভ প্রকাশ।
২০২৬ টি-টুয়েন্টি বিশ্বকাপে বাংলাদেশের জায়গায় খেলবে স্কটল্যান্ড। কাল এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এই খবর জানিয়েছে আইসিসি। নিরাপত্তা শঙ্কায় বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি) ভারতে দল পাঠাতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিল। বাংলাদেশের দাবি ছিল, তাদের ম্যাচগুলো যেন শ্রীলঙ্কায় সরানো হয়। আইসিসি সেই দাবি মানেনি। নিয়ন্ত্রক সংস্থার এই সিদ্ধান্তে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন পাকিস্তানের সাবেক অধিনায়ক শহীদ আফ্রিদি। এক্স পোস্টে তিনি লিখেছেন, ‘বাংলাদেশে ও আইসিসির বিভিন্ন টুর্নামেন্টে খেলা একজন সাবেক আন্তর্জাতিক ক্রিকেটার হিসেবে আজ আইসিসির আচরণে আমি খুবই হতাশ। ২০২৫ সালে পাকিস্তান সফরে না যাওয়ার বিষয়ে ভারতের নিরাপত্তা উদ্বেগ আইসিসি মেনে নিয়েছে, কিন্তু বাংলাদেশের ক্ষেত্রে তাদের বোঝাপড়া ভিন্ন।’ গত বছর ভারত চ্যাম্পিয়নস ট্রফিতে খেলতে পাকিস্তানে যেতে রাজি হয়নি। পরে আইসিসি তাদের দাবি মেনে ভারতের সব ম্যাচ দুবাইয়ে আয়োজন করে। অংশগ্রহণকারী অন্য সব দল পাকিস্তানে গেলেও ভারতের সঙ্গে খেলার জন্য তাদের দুবাইয়ে যেতে হয়েছিল। আইসিসি ভারত ও বাংলাদেশের ক্ষেত্রে একই নীতি অনুসরণ করেনি মন্তব্য করে আফ্রিদি আরও লিখেছেন, ‘ক্রিকেট পরিচালনায় সবার জন্য একই নিয়ম ও ন্যায্যতা থাকা দরকার। বাংলাদেশের খেলোয়াড় ও কোটি কোটি সমর্থক সম্মানের দাবিদার—মিশ্রনীতি নয়। আইসিসির উচিত সম্পর্ক গড়া, ভাঙা নয়।’
