কর্তৃত্ববাদের উত্থানে দেশে-বিদেশে কঠিন প্রশ্নের মুখোমুখি ভারত:
নিজস্ব প্রতিবেদক: Kanak Sarwarপ্রকাশ: রবিবার, ২ জুন, ২০২৪
ওয়াশিংটনে এসএপি’র প্যানেল আলোচনায় যুক্তরাষ্ট্রের কূটনীতিক ও বিশেষজ্ঞরা
গণতান্ত্রিক অভিযাত্রায় হুমকি, অর্থনৈতিক বৈষম্য এবং অবনতিশীল মানবাধিকার পরিস্থিতিতে যখন উদ্বেগ বেড়েই চলছে তখন ভারতের ভোটাররা তাদের পছন্দের নেতা নির্বাচনে ভোটাধিকারে অংশগ্রহণ করছেন। আর এই পরিস্থিতি দেশে এবং বিদেশে কী ধরনের চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে তা নিয়েই শুক্রবার যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটন ডিসিতে এক প্যানেল আলোচনায় নিজেদের বক্তব্য তুলে ধরেছেন বিশ্লেষকরা। চলমান পরিস্থিতিতে ভারতে কী ঘটছে তা নিয়ে বিশ্লেষকরা যেমন আলোচনা করেছেন ঠিক তেমনি এই অবস্থা থেকে বেরুনোর পথ খোঁজে বের করার ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন। ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে চীনকে টেক্কা দিতে যদিও ভারত-যুক্তরাষ্ট্র বিশাল অঙ্কের বাণিজ্য করছে তবুও যুক্তরাষ্ট্রের উচিত ভারতে অব্যাহত মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিষয়ে মনোনিবেশ করা।
ওয়াশিংটনে ন্যাশনাল প্রেস ক্লাবে 'সাউথ এশিয়া পার্সপেক্টিভস ( এসএপি)’র আয়োজনে 'নেভিগেটিং ক্রসরোডস: ইন্ডিয়াস ইকোনমি, ডেমোক্রেসি এন্ড কোয়েস্ট ফর হিউম্যান রাইটস' শীর্ষক এক প্যানেল আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। এই আলোচনায় অংশ নিয়ে কূটনীতিক, লেখক, সাংবাদিক ও মানবাধিকার কর্মী এসব কথা বলেন।
আলোচনায় অংশগ্রহণ করেন সাউথ এশিয়া পার্সপেক্টিভস’র সম্পাদক ও উইলসন সেন্টারের সিনিয়র স্কলার অ্যাম্বাসেডর উইলিয়াম বি মাইলাম, ইউএস চীফ এগ্রিকালচারাল নেগোশিয়েটর অ্যাম্বাসেডর ইসলাম সিদ্দিকী, লেখক সলিল ত্রিপাঠি এবং মানবাধিকার কর্মী সরিতা পাণ্ডে।

প্যানেল আলোচনার দর্শকসারিতে ছিলেন কংগ্রেসের টম ল্যানটস হিউম্যান রাইটস কমিশন, স্টেট ডিপার্টমেন্ট, ফ্রিডম হাউস, হিন্দুস ফর হিউম্যান রাইটস, ইন্ডিয়ান আমেরিকান মুসলিম কাউন্সিলের প্রতিনিধিবৃন্দ। এছাড়াও জাতিসংঘ ও বিশ্বব্যাংক বিশেষজ্ঞ, সাবেক রাষ্ট্রদূতসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক মিডিয়ার প্রতিনিধি।
অ্যাম্বাসেডর উইলিয়াম বি মাইলাম বলেন, "নির্বাচন যেভাবেই হোক তার একটা প্রভাব তৈরি হয়। ভারতের নির্বাচন কী পরিণতি বয়ে নিয়ে আসবে সেটা দেখার মতো গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। ধীরে হলেও ভারত কর্তৃত্ববাদী শাসনব্যবস্থার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। ভারতকে গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার ভাবা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য বিষয়টি এখন বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।"
তিনি বিশেষজ্ঞদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন কর্তৃত্ববাদী শাসকেরা বিভিন্ন দেশে যেভাবে অপ্রপচার যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছে সেদিকে তারা যেন বিশেষ মনযোগ দেন। মাইলাম মনে করেন গণতন্ত্র বিরোধী এসব অপপ্রচার খুব বেশী করে চালানো হচ্ছে এবং চরমভাবে তা কার্যকর করা হচ্ছে।
মাইলাম বলেন, "কর্তৃত্ববাদ সংক্রান্ত অপপ্রচারের মাধ্যমে কর্তৃত্ববাদী শাসনব্যবস্থা বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। ২০-৩০ বছরের ব্যবধানে এরকম কর্তৃত্ববাদ প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।"
যুক্তরাষ্ট্রসহ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে গণতন্ত্র এবং আইনের শাসন বিরোধী উত্থানের যে প্রবণতা দেখা দিয়েছে তা নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন মাইলাম।
ভারতের অর্থনৈতিক উন্নয়নের তৈরি করা গল্প, বানােয়াট তথ্য এবং এগুলোর প্রভাবের কথা উল্লেখ করে লেখক সলিল ত্রিপাঠি বলেন, "সুন্দর সুন্দর শপিং মল আর বিমানবন্দর নিয়ে বড় বড় গল্প করছে মানুষ। আমার দুশ্চিন্তা তখনি বেড়ে গেল যখন দেখলাম এশিয়ার অর্থনীতিতে মন্দা দেখা দেবার সঙ্গে সঙ্গে সুন্দর সুন্দর ঐসব অবকাঠামাগুলোতে ভূতুড়ে নীরবতা। এই পরিস্থিতিতে ধর্ম নিয়ে রাজনীতিটা হয় বিপদজনকভাবে। কারণ ঐ সময়টাতে আপনি যখন সত্যিকারের জটিল ইস্যুগুলো নিয়ন্ত্রণ এবং মোকাবিলা করতে পারেননা তখন আপনি সংখ্যাগরিষ্ট এবং ক্ষমতাশীল গোষ্ঠীকে এমনভাবে নিয়ন্ত্রণ করেন যে মনে হচ্ছে সাজাটা তাদের প্রাপ্য। এই পরিস্থিতির যারা ভুক্তভোগী তাদেরকে রাষ্ট্রের শত্রু বলে গণ্য করা হয়।"
তিনি বলেন, "এটা খুব পরিতাপের বিষয় যে, ভারতের ৮০ শতাংশ যুবক বেকার। মাস্টার্স এবং পিএইচডি ডিগ্রিধারী হাজার হাজার শিক্ষার্থী চাকরির অভাবে নিম্ন পর্যায়ের চাকুরির প্রত্যাশায় আবেদন করতে বাধ্য হচ্ছে।"
ভারতের স্বজনতোষী পুঁজিবাদ প্রসঙ্গে সলিল বলেন, "ভারতে আপনি যদি বিদেশী কোনো বিনিয়োগকারী হন আর আপনার প্রতিদ্বন্দ্বী যদি হন আম্বানি এবং আদানির মতো কেউ তাহলে হয় আপনাকে দেশটিতে ব্যবসা বিক্রি করে দিতে হবে নতুবা তাদের সঙ্গে চুক্তি করতে হবে।"
অর্থনৈতিক অসমতা এবং বৈষম্য প্রসঙ্গে সলিল গুজরাটের কিছু মুসলমানদের সঙ্গে ঘটে যাওয়া ঘটনার কথা উল্লেখ করেন। তিনি তাদের সঙ্গে কথা বলেছেন যারা বলেছে যে, তারা ন্যায় বিচারের প্রত্যাশা বাদ দিয়েছে। সলিল বলেন, "তারা ন্যায় বিচারের আশা করেনা। তারা এখন নিজেদের সামর্থ বাড়াতে চিকিৎসক, ইঞ্জিনিয়ার এবং হিসাবরক্ষকের মতো পেশায় মন দিয়েছে। কারণ তাদের কেউ চাকরি দিতে চায়না। সিভিতে তাদের নাম দেখে সাক্ষাতকারের জন্য কেউ ডাকেনা।"
সলিল মনে করেন ভারতের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির বিষয়টি ফাঁকা বুলি। তিনি মনে করেন ভারতের সংখ্যাগরিষ্ট এবং প্রভাবশালীরা তাদের এই দুর্ভোগের বিষয়টি বুঝতে শুরু করেছে।
সলিল বলেন, "নির্যাতিত এসব মানুষ এবং সংখ্যালঘুরা যেন রাষ্ট্রের শত্রুতে পরিণত হয়েছে।"
অ্যাম্বাসেডর ইসলাম সিদ্দিকী অতীত এবং বর্তমান প্রেক্ষাপটে সবিস্তারে যুক্তরাষ্ট্র এবং ভারতের বাণিজ্যিক সম্পর্কের কথা তুলে ধরেন। তিনি ভারতের সাংবিধানিক গুরুত্বের কথা তুলে ধরে বলেন, "ভারতে গণতন্ত্রের বাজে এবং গণ্ডগোলের চেহারা আমরা দেখতে পাচ্ছি যদিও মাঝে মাঝে নির্বাচিত নেতারা দেশটির সংবিধান এবং ধর্মনিরপেক্ষতার প্রতি সবসময় তাদের আনুগত্যের কথা বলে থাকে। এ প্রতিশ্রুতির বিষয়টাই মূলত ভারতের গণতন্ত্রকে প্রাণবন্ত করে।"
প্রধানমন্ত্রী মোদি তার জনসমর্থন বাড়াতে ধর্মীয় বিভাজনকে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসাবে ব্যবহার করছেন বলে মনে করেন অ্যাম্বাসেডর ইসলাম সিদ্দিকী। তিনি বলেন, "মনিপুরে সহিংসতায় ৬৫,০০০ খ্রিস্টান গৃহহীন এবং ২৫০ টি চার্চ পুড়িয়ে দেবার পরও কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করেননি প্রধানমন্ত্রী মোদি। ছয় মাস পর যুক্তরাষ্ট্র সফর শেষে দেশে ফিরে মনিপুর সংকট নিয়ে কথা বলেন মোদি।"
তিনি বলেন, "ভারতে যা ঘটছে তা জানে বাইডেন প্রশাসন। কিন্তু ভূরাজনৈতিক কারণে এবং চীনকে মোকাবিলায় আপাতত অনেক বিষয়ে কথা বলছেনা যুক্তরাষ্ট্র।"
ভারতে গণমাধ্যমের স্বাধীনতার ঘাটতি এবং মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেন সাংবাদিক এবং মানবাধিকার কর্মী সরিতা পাণ্ডে। তিনি বলেন, "বিগত ১০ বছরের বেশী সময় ধরে প্রধানমন্ত্রী মোদি প্রশাসনের বিভিন্ন মন্ত্রী এবং নেতাদের দুর্নীতি, প্রতারণা, অনিয়ম এবং সন্ত্রাস নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ কোনো রিপোর্ট প্রকাশ করতে পারছেনা প্রধান সারির গণমাধ্যমগুলো। তাদের কয়েকজনের বিরুদ্ধে ধর্ষণ, হামলা এবং খুনের মতো অভিযোগ রয়েছে। দুই মাসে আগে একটা তথ্য ফাঁস হয়েছে যাতে বলা হয়েছে, গোপন কাজে ব্যবহার করার জন্য মোদির দল অন্তত এক বিলিয়ন ডলার সহায়তা পেয়েছে। গণমাধ্যমগুলো মোদিকে প্রশ্ন করার বদলে উল্টো সুরক্ষা দেবার জন্য ওভারটাইম ডিউটি করছে।"
গণমাধ্যম নিয়ন্ত্রণে কীভাবে রাষ্ট্রযন্ত্রকে ব্যবহার করা হচ্ছে তা নিয়ে কথা বলতে গিয়ে সরিতা পাণ্ডে গুজরাটে গণহত্যার সঙ্গে সম্পৃক্ত বিষয় নিয়ে তেহেলকা ম্যাগাজিনে প্রকাশিত রিপোর্টের প্রসঙ্গ তুলে ধরেন। তিনি বলেন, "তখনকার সময়ে গুজরাটে মোদির ঘনিষ্ট সহযোগী, যিনি বর্তমানে দেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, অমিত শাহকে গ্রেফতার করা হয়েছিলো এবং তার বিচার চলমান ছিলো। মোদি প্রধানমন্ত্রী হবার পরই ঐ মামলার বিচারককে দ্রুত বদলি করে দেওয়া হয়। পরবর্তী বিচারক ঐ মামলা বাতিল করে দিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিলেন। তার ফলস্বরুপ এক সপ্তাহের মধ্যেই ঐ বিচারকের লাশ পাওয়া গিয়েছিলো। তৃতীয় বিচারক এই মামলার দায়িত্ব নেবার পর তিনি অপ্রত্যাশিতভাবে অমিত শাহকে এই মামলা থেকে অব্যাহতি দেন। আর এর কারণ ব্যাখ্যা না করে এই বিচারক বলেন, রাজনৈতিক কারণে ভুল করে মামলায় অমিত শাহকে অভিযুক্ত করা হয়েছিলো।"
রিপোটার্স উইদাউট বর্ডার্স এবং কমিটি টু প্রটেক্ট জার্নালিস্টসের প্রকাশিত রিপোর্টগুলোর তথ্যের সঙ্গে একমত প্রকাশ করে সরিতা পাণ্ডে বলেন, "সাংবাদিকদের জন্য বিপজ্জনক দেশগুলোর একটি দেশে পরিণত হয়েছে ভারত।"
আলোচনায় মডারেটরের দায়িত্ব পালন করেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রাক্তন কূটনীতির এবং সাউথ এশিয়া পার্সপেক্টিভস’র এডিটর এ্যাট লার্জ জন এফ ড্যানিলোয়িচ এবং আগত অতিথিদের স্বাগত জানান সাউথ এশিয়া পার্সপেক্টিভস’র নির্বাহী সম্পাদক মুশফিকুল ফজল আনসারী।
Related News

ভারত-পাকিস্তান সংঘর্ষ!
বেলুচিস্তানে পাকিস্তানি নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষে তিন ‘ভারতীয় প্রক্সি বাহিনীর’ সদস্য নিহত হয়েছে। রোববার (২৫ জানুয়ারি) এক বিবৃতিতে দেশটির আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ দপ্তর (আইএসপিআর) জানিয়েছে, বেলুচিস্তানের পাংজুর জেলায় পরিচালিত গোয়েন্দা-ভিত্তিক অভিযানে (আইবিও) ‘ভারতীয় প্রক্সি ফিতনা আল হিন্দুস্তানের’ সঙ্গে যুক্ত তিন ‘সন্ত্রাসীকে’ নিরাপত্তা বাহিনী গুলি করে হত্যা করেছে। বিবৃতিতে বলা হয়, অভিযান পরিচালনার সময় নিরাপত্তা বাহিনী কার্যকরভাবে সন্ত্রাসীদের অবস্থানে অভিযান চালায় এবং তীব্র গুলি বিনিময়ের পর স্থানীয় এলাকার কমান্ডার ফারুক ওরফে সোরো, আদিল এবং ওয়াসিমকে গুলি করে হত্যা করা হয়। নিহত ‘সন্ত্রাসীদের’ কাছ থেকে অস্ত্র ও গোলাবারুদও উদ্ধার করা হয়েছে। এলাকায় ভারত-সমর্থিত অন্য ‘সন্ত্রাসীদের’ ধরতে স্যানিটাইজেশন অভিযান পরিচালিত হচ্ছে বলেও জানায় সংস্থাটি। আইএসপিআর প্রতিশ্রুতি দিয়ে বলেছে, ‘আজমে ইস্তেহকাম’ দৃষ্টিভঙ্গির অধীনে পাকিস্তানের নিরাপত্তা বাহিনী এবং আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর নিরলস সন্ত্রাসবাদ বিরোধী অভিযান পাকিস্তান থেকে বিদেশি সমর্থিত সন্ত্রাসবাদের হুমকি নির্মূল করার জন্য পূর্ণ গতিতে অব্যাহত থাকবে। জিও নিউজের খবরে বলা হয়, ২০২১ সালে তালেবান আফগানিস্তানের নিয়ন্ত্রণ পুনরুদ্ধারের পর থেকে পাকিস্তানে সীমান্তবর্তী সন্ত্রাসী কার্যক্রম বৃদ্ধি পেয়েছে। আফগানিস্তানের সীমান্তবর্তী কেপি এবং বেলুচিস্তান প্রদেশগুলো এই হামলার দ্বারা বিশেষভাবে প্রভাবিত হয়েছে।
বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের ক্ষেত্রে একটি বিপজ্জনক দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে পারে-দিল্লিতে হাসিনার বক্তব্য প্রসঙ্গে ঢাকা
মানবতাবিরোধী অপরাধে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত পলাতক সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ভারতের নয়াদিল্লিতে প্রকাশ্যে একটি অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেয়ার সুযোগ দেয়ার ঘটনায় গভীর ক্ষোভ ও বিস্ময় প্রকাশ করেছে সরকার। রবিবার (২৫ জানুয়ারি) এ বিষয়ে বিবৃতি দিয়েছে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। গত ২৩ জানুয়ারি নয়াদিল্লির ওই অনুষ্ঠানে শেখ হাসিনা বাংলাদেশের সরকার উৎখাতের আহ্বান জানান এবং আসন্ন জাতীয় নির্বাচনকে ভণ্ডুল করার লক্ষ্যে সহিংসতায় উসকানিমূলক বক্তব্য দেন বলে বিবৃতিতে অভিযোগ করেছে ঢাকা। বিবৃতিতে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানায়, শেখ হাসিনা তার বক্তব্যে দলীয় অনুসারী ও সাধারণ জনগণকে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে জড়িত হতে প্রকাশ্যভাবে উসকানি দিয়েছেন। এতে বাংলাদেশের শান্তি, নিরাপত্তা ও গণতান্ত্রিক উত্তরণ মারাত্মকভাবে হুমকির মুখে পড়েছে বলে সরকার মনে করে। এতে আরও বলা হয়, দ্বিপাক্ষিক প্রত্যর্পণ চুক্তির আওতায় শেখ হাসিনাকে বাংলাদেশের কাছে হস্তান্তরের জন্য ভারতকে বারবার অনুরোধ জানানো হলেও এখনো এ বিষয়ে কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেয়া হয়নি। বরং, ভারতের মাটিতে দাঁড়িয়ে তাকে এ ধরনের উসকানিমূলক বক্তব্য দেয়ার সুযোগ দেয়া হয়েছে, যা বাংলাদেশের জনগণের অনুভূতিকে গভীরভাবে আঘাত করেছে। বাংলাদেশ সরকার মনে করে, ভারতের রাজধানীতে এ ধরনের অনুষ্ঠানের আয়োজনের অনুমতি দেয়া এবং একজন দণ্ডিত ব্যক্তিকে প্রকাশ্যে ঘৃণামূলক বক্তব্য দেয়ার সুযোগ করে দেয়া রাষ্ট্রসমূহের পারস্পরিক সম্পর্কের প্রচলিত নীতিমালা- যেমন সার্বভৌমত্বের প্রতি শ্রদ্ধা, অভ্যন্তরীণ বিষয়ে অনধিকার হস্তক্ষেপ না করা এবং সুপ্রতিবেশীসুলভ আচরণের পরিপন্থি। এটি বাংলাদেশ সরকার ও জনগণের প্রতি একটি স্পষ্ট অবমাননা বলেও বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়। বিবৃতিতে সতর্ক করে বলা হয়, এ ধরনের ঘটনা বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের ভবিষ্যতের ক্ষেত্রে একটি বিপজ্জনক দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে পারে। একইসঙ্গে এতে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নির্বাচিত সরকারগুলোর পক্ষে পারস্পরিক কল্যাণমূলক দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক গড়ে তোলা ও এগিয়ে নেয়ার সক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের নেতৃত্বের সাম্প্রতিক উসকানিমূলক বক্তব্যের প্রসঙ্গ টেনে বিবৃতিতে বাংলাদেশ সরকার জানায়, এসব কর্মকাণ্ডই প্রমাণ করে কেন অন্তর্বর্তী সরকার দলটির কার্যক্রম নিষিদ্ধ করতে বাধ্য হয়েছে। নির্বাচনের আগে ও নির্বাচন দিবসে সংঘটিত যেকোনো সহিংসতা ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের দায় সংশ্লিষ্ট সংগঠনের ওপর বর্তাবে বলেও বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়। এছাড়াও বাংলাদেশ সরকার জানিয়েছে, আসন্ন জাতীয় নির্বাচনকে কেন্দ্র করে যেকোনো ধরনের সহিংসতা ও ষড়যন্ত্র প্রতিহত করতে প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থা নেয়া হবে এবং দেশের শান্তি ও গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া রক্ষায় সরকার কঠোর অবস্থান নেবে।

বাংলাদেশ কে বিশ্বকাপ থেকে বাদ দেওয়ায় পাকিস্তানি ক্রিকেটার আফ্রিদির ক্ষোভ প্রকাশ।
২০২৬ টি-টুয়েন্টি বিশ্বকাপে বাংলাদেশের জায়গায় খেলবে স্কটল্যান্ড। কাল এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এই খবর জানিয়েছে আইসিসি। নিরাপত্তা শঙ্কায় বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি) ভারতে দল পাঠাতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিল। বাংলাদেশের দাবি ছিল, তাদের ম্যাচগুলো যেন শ্রীলঙ্কায় সরানো হয়। আইসিসি সেই দাবি মানেনি। নিয়ন্ত্রক সংস্থার এই সিদ্ধান্তে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন পাকিস্তানের সাবেক অধিনায়ক শহীদ আফ্রিদি। এক্স পোস্টে তিনি লিখেছেন, ‘বাংলাদেশে ও আইসিসির বিভিন্ন টুর্নামেন্টে খেলা একজন সাবেক আন্তর্জাতিক ক্রিকেটার হিসেবে আজ আইসিসির আচরণে আমি খুবই হতাশ। ২০২৫ সালে পাকিস্তান সফরে না যাওয়ার বিষয়ে ভারতের নিরাপত্তা উদ্বেগ আইসিসি মেনে নিয়েছে, কিন্তু বাংলাদেশের ক্ষেত্রে তাদের বোঝাপড়া ভিন্ন।’ গত বছর ভারত চ্যাম্পিয়নস ট্রফিতে খেলতে পাকিস্তানে যেতে রাজি হয়নি। পরে আইসিসি তাদের দাবি মেনে ভারতের সব ম্যাচ দুবাইয়ে আয়োজন করে। অংশগ্রহণকারী অন্য সব দল পাকিস্তানে গেলেও ভারতের সঙ্গে খেলার জন্য তাদের দুবাইয়ে যেতে হয়েছিল। আইসিসি ভারত ও বাংলাদেশের ক্ষেত্রে একই নীতি অনুসরণ করেনি মন্তব্য করে আফ্রিদি আরও লিখেছেন, ‘ক্রিকেট পরিচালনায় সবার জন্য একই নিয়ম ও ন্যায্যতা থাকা দরকার। বাংলাদেশের খেলোয়াড় ও কোটি কোটি সমর্থক সম্মানের দাবিদার—মিশ্রনীতি নয়। আইসিসির উচিত সম্পর্ক গড়া, ভাঙা নয়।’

নিরাপত্তা উদ্বেগে বাংলাদেশে ভারতীয় কূটনীতিকদের জন্য ‘নন-ফ্যামিলি পোস্টিং’ ঘোষণা
কথিত নিরাপত্তা পরিস্থিতির অবনতির আশঙ্কায় বাংলাদেশে কর্মরত ভারতীয় কূটনীতিকদের জন্য ‘নন-ফ্যামিলি পোস্টিং’ ঘোষণা করেছে ভারত সরকার। তবে ঢাকাসহ দেশের পাঁচটি ভারতীয় কূটনৈতিক মিশন পূর্ণ সক্ষমতায় তাদের কার্যক্রম চালিয়ে যাবে। মঙ্গলবার (২০ জানুয়ারি) হিন্দুস্থান টাইমস–এ প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে জানানো হয়, সামগ্রিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে এ সিদ্ধান্ত দীর্ঘদিন ধরেই প্রক্রিয়াধীন ছিল। এর অংশ হিসেবে ঢাকার ভারতীয় হাইকমিশন এবং চট্টগ্রাম, খুলনা, রাজশাহী ও সিলেটের চারটি সহকারী হাইকমিশনে কর্মরত কর্মকর্তাদের পরিবার-পরিজনদের ভারতে ফিরে যাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, কবে নাগাদ কূটনীতিকদের পরিবার প্রত্যাবর্তন করবে—সে বিষয়ে এখনো নির্দিষ্ট কোনো সময়সূচি নির্ধারণ করা হয়নি। একই সঙ্গে নিরাপত্তাজনিত কারণে বাংলাদেশে কর্মরত ভারতীয় কূটনীতিকদের মোট সংখ্যাও প্রকাশ করা হয়নি। ‘নন-ফ্যামিলি পোস্টিং’ কূটনৈতিক কর্মীদের জন্য সবচেয়ে কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থাগুলোর একটি হিসেবে বিবেচিত। বর্তমানে পাকিস্তানেও ভারতীয় কূটনীতিকদের ক্ষেত্রে অনুরূপভাবে ‘নো চিলড্রেন পোস্টিং’ কার্যকর রয়েছে। ভারতের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে, মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে বাংলাদেশে উগ্র ও চরমপন্থী গোষ্ঠীর তৎপরতা বেড়েছে এবং পাকিস্তান-সংশ্লিষ্ট উপাদানগুলো তুলনামূলকভাবে বেশি সুযোগ পাচ্ছে। এর ফলে বাংলাদেশে কর্মরত কূটনীতিকদের পরিবারের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ আরও তীব্র হয়েছে। এর আগে ভারত অভিযোগ করেছিল, বাংলাদেশে সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে অন্তর্বর্তী সরকার ব্যর্থ হয়েছে। তবে ঢাকা এসব অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে। একই সঙ্গে উগ্রপন্থী গোষ্ঠীগুলোর বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান না নেওয়ার অভিযোগও তুলেছে নয়াদিল্লি। ২০২৪ সালের আগস্টে তত্ত্বাবধায়ক সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের টানাপোড়েন বাড়তে থাকে। সাম্প্রতিক বিক্ষোভ ও সহিংস ঘটনার পর ঢাকায় ও নয়াদিল্লিতে উভয় দেশের কূটনৈতিক মিশনের নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। গত মাসে চট্টগ্রামে ভারতীয় মিশনের বাইরে সহিংস বিক্ষোভের ঘটনাও ঘটে। তবে একই সময়ে ভারত বিএনপির সঙ্গে যোগাযোগ বাড়িয়েছে। আগামী ১২ ফেব্রুয়ারির জাতীয় নির্বাচনে দলটি সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। সম্প্রতি ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস. জয়শঙ্কর বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার জানাজায় অংশ নেন এবং দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। রাজনৈতিক মহলে এসব ঘটনাকে ভারত-বিএনপি সম্পর্কোন্নয়ের ইঙ্গিত হিসেবে দেখা হচ্ছে।
