সাবওয়ের নিরাপত্তায় ৭৭ মিলিয়ন ডলার বহাল-এনওয়াইপিডির রাতের ওভারটাইম
নিজস্ব প্রতিবেদক: ksarwarপ্রকাশ: মঙ্গলবার, ২৩ ডিসেম্বর, ২০২৫
নিউইয়র্ক সিটির সাবওয়ে ব্যবস্থায় ২০২৬ সালেও এনওয়াইপিডি সদস্যদের অতিরিক্ত দায়িত্ব পালনের (ওভারটাইম) খরচ বহাল রাখবে নিউইয়র্ক স্টেট সরকার। এমন ঘোষণা দিয়েছেন গভর্নর ক্যাথি হোচুল। গত ১৮ ডিসেম্বর দেওয়া এক ঘোষণায় তিনি জানান, যাত্রী সংখ্যা বেড়েছে, তবুও সাবওয়েতে অপরাধের হার বর্তমানে গত ১৬ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে এসেছে। তবে যাত্রীদের নিরাপত্তা আরো জোরদার করতে সাবওয়েতে পুলিশের বাড়তি উপস্থিতি অব্যাহত থাকবে বলে জানান। গভর্নর হোচুল বলেন, নিউইয়র্ক স্টেটের ইতিহাসে এই প্রথম স্টেট সরকার এনওয়াইপিডির ওভারটাইম খরচে সরাসরি অর্থায়ন করছে। আমরা আগেও করেছি, আবারও করছি। তার ভাষায়, সাবওয়ে কেবল একটি পরিবহন ব্যবস্থা নয়, বরং এটি নিউইয়র্কবাসীর দৈনন্দিন জীবনের অপরিহার্য অংশ। এখানকার নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই স্টেট সরকারের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার। চলতি বছরের জানুয়ারিতে শহরের প্রতিটি রাতভর চলাচলকারী সাবওয়ে ট্রেনে এনওয়াইপিডি কর্মকর্তাদের মোতায়েন করা হয়। সে সময় এটিকে একটি সাময়িক ব্যবস্থা হিসেবে ঘোষণা করা হলেও বৃহস্পতিবারের ঘোষণায় স্পষ্ট করা হয়েছে যে, এই উদ্যোগ দীর্ঘমেয়াদে চলবে। সাবওয়ে নিরাপত্তা জোরদার করতে নতুন করে স্টেট সরকার অতিরিক্ত ৭৭ মিলিয়ন ডলার বরাদ্দ দিচ্ছে। এ বরাদ্দ দিয়ে মূলত পুলিশ সদস্যদের অতিরিক্ত শিফট ও ওভারটাইম ব্যয় মেটাতে ব্যবহৃত হবে।
Related News
যুক্তরাষ্ট্রের ভুয়া ড্রাইভার লাইসেন্স, পাসপোর্ট, গ্রীন কার্ড এবং এসএসএন কার্ড বিক্রি-বাংলাদেশি জাহিদ হাসান গ্রেফতার
ঢাকা থেকে যুক্তরাষ্ট্রে ভুয়া ড্রাইভার লাইসেন্স, ইউএস পাসপোর্ট, গ্রীন কার্ড এবং সোশ্যাল সিকিউরিটি কার্ড বিক্রির অভিযোগে ঢাকায় ২৯ বছর বয়সী বাংলাদেশি আইটি ব্যবসায়ী জাহিদ হাসানের বিরুদ্ধে ইউএস ডিস্ট্রিক্ট কোর্ট অব মন্টানাতে অভিযোগ দায়ের করেছে যুক্তরাষ্ট্র বিচার বিভাগ। অভিনব কায়দায় অনলাইন মার্কেট প্লেসের মাধ্যমে জালিয়াতি ও ভুয়া পরিচয়পত্র তৈরির বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল কর্তৃপক্ষের কঠোর অভিযানের অংশ হিসেবে তার বিরুদ্ধে গুরুতর জালিয়াতির অভিযোগ আনা হয়েছে। গ্রেফতারের পর জাহিদের জালিয়াতি আন্তর্জাতিক পর্যায়ে পরিচয় জালিয়াতি চক্রের বিস্তার ও সাইবার অপরাধের ঝুঁকি নতুন করে সামনে এনেছে। যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগ ইউএস ডিস্ট্রিক্ট কোর্ট অব মন্টানা ১৮ ডিসেম্বর আদালতে ৯টি ধারার অভিযোগে জাহিদ হাসানকে অনলাইন মার্কেটপ্লেস পরিচালনার মাধ্যমে মিথ্যা পরিচয়পত্র বিক্রির অভিযোগে অভিযুক্ত করেছে। ইউএস অ্যাটর্নি কার্ট আলমে এই তথ্য জানান। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র্র সরকারের পক্ষ থেকে পরিচয়পত্রের নকল বিক্রিতে ব্যবহৃত তিনটি অনলাইন ডোমেইন জব্দ করা হয়েছে।
জাহিদ হাসানকে ছয়টি মিথ্যা পরিচয়পত্র হস্তান্তরের অভিযোগ, দুটি ভুয়া পাসপোর্ট ব্যবহারের অভিযোগ এবং একটি সোশ্যাল সিকিউরিটি কার্ড জালিয়াতির অভিযোগ মামলায় অভিযুক্ত করা হয়েছে। আদালতে অভিযোগ প্রমাণিত হলে মিথ্যা পরিচয়পত্র হস্তান্তর বা ভুয়া পাসপোর্ট ব্যবহারের প্রতিটি ধারায় সর্বোচ্চ ১৫ বছর কারাদণ্ড এবং আড়াই লাখ ডলার পর্যন্ত জরিমানা হতে পারে। সোশ্যাল সিকিউরিটি কার্ড জালিয়াতির ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ পাঁচ বছর কারাদণ্ড এবং আড়াই লাখ ডলার পর্যন্ত জরিমানা ধার্য হতে পারে।
অভিযোগে আরো বলা হয়েছে, ২০২১ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত জাহিদ হাসান বাংলাদেশে অবস্থান করে “TechTreek” (টেকট্রিক) এবং “EGiftCardStoreBD” (ই-গিফটকার্ডস্টোরবিডি) নামে একাধিক অনলাইন ব্যবসা পরিচালনা করেছেন। এ ওয়েবসাইটগুলোতে ভুয়া পরিচয়পত্রের ডিজিটাল কপি বিক্রি করা হতো, যার মধ্যে ছিল ইউএস পাসপোর্ট, ইউএস সামাজিক সিকিউরিটি কার্ড এবং মন্টানা ড্রাইভার লাইসেন্স। এ নকল পরিচয়পত্রগুলো মূলত ব্যাংক, অনলাইন পেমেন্ট প্রসেসর, সোশ্যাল মিডিয়া এবং ডিজিটাল কারেন্সি প্ল্যাটফর্মে ভুয়া অ্যাকাউন্ট তৈরি করতে ব্যবহৃত হতো।
প্রতিটি নকল ডকুমেন্টের দামও উল্লেখযোগ্যভাবে কম ছিল। মূলত ‘ডলার স্টোর’-এর পণ্যের মতো স্বল্পমূল্যের ছিল। অভিযোগ অনুযায়ী, একটি ইউএস পাসপোর্টের ডিজিটাল টেমপ্লেটের দাম ছিল ১২ ডলার, ইউএস সামাজিক সিকিউরিটি কার্ড ৯ দশমিক ৩৭ ডলার এবং মন্টানা ড্রাইভার লাইসেন্স ১৪ দশমিক শূন্য ৫ ডলার। চার বছরের মধ্যে জাহিদ হাসান তার টেকট্রিক প্ল্যাটফর্ম থেকে বিশ্বব্যাপী ১ হাজার ৪০০ জনেরও বেশি গ্রাহকের কাছ থেকে ২ দশমিক ৯ মিলিয়ন ডলারের বেশি অর্থ উপার্জন করেন।
গত ১৩ মে বোজম্যান, মন্টানা থেকে একজন ব্যক্তির সঙ্গে বিটকয়েনের মাধ্যমে লেনদেন করার পর জাহিদ হাসান ওই ব্যক্তিকে ভুয়া ইউএস পাসপোর্ট, সোশ্যাল সিকিউরিটি কার্ড এবং মন্টানা ড্রাইভার লাইসেন্সের ডিজিটাল টেমপ্লেট সরবরাহ বা সরবরাহের চেষ্টা করেন।
জাহিদ হাসানের অনলাইন ব্যবসার জন্য ব্যবহৃত তিনটি ডোমেইনও জব্দ করা হয়েছে- www.techtreek.com, www.egiftcardstorebd.com, www.idtempl.com. এ সাইটগুলোতে এখন ভিজিট করলে দর্শকরা সাইটটি ফেডারেল কর্তৃপক্ষের দ্বারা জব্দ করা হয়েছে বার্তা দেখেন। মামলাটি যুক্তরাষ্ট্রের অ্যাসিস্ট্যান্ট অ্যাটর্নি বেনজামিন হারগ্রোভ পরিচালনা করছেন। তদন্ত পরিচালনা করেছে এফবিআইয়ের বিলিংস ডিভিশন এবং সল্ট লেক সিটি সাইবার টাস্ক ফোর্স, যা এফবিআইয়ের আন্তর্জাতিক অপারেশন ডিভিশন এবং ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের কন্ট্রাটেরোরিজম ও ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম ইউনিটের সঙ্গে সমন্বিতভাবে করা হয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের মানবাধিকার রিপোর্ট ২০২৪
বাংলাদেশে রাজনীতিক ও ইমামদের ইহুদিবিদ্বেষী মন্তব্য, গত সরকারের আমলে নিরাপত্তা বাহিনীর নির্যাতনে নিহতদের সংখ্যা এখনো প্রকাশ না করা, গণমাধ্যমের স্বাধীনতাসহ বেশকিছু বিষয় উঠে এসেছে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর প্রকাশিত প্রতিবেদনে। বাংলাদেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে বার্ষিক এই প্রতিবেদনে দেশের 'পরিস্থিতি এখন স্থিতিশীল' থাকলেও 'কিছু বিষয় নিয়ে উদ্বেগ' রয়ে গেছে বলে জানানো হয়েছে। যদিও ওই প্রতিবেদনে বাংলাদেশের মানবাধিকার ক্ষেত্রে কোনো কোনো বিষয় নিয়ে উদ্বেগ এখনো রয়ে গেছে তা উল্লেখ করা হয়নি। প্রতিবেদনটি করা হয়েছে ২০২৪ সালে, অর্থাৎ গত বছর জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত সংঘটিত ঘটনার বিষয়ে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে। ওই বছরের ৫ই অগাস্ট পর্যন্ত ক্ষমতায় ছিল শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকার। আন্দোলনে ওই সরকারের পতনের পর ৮ই অগাস্ট ক্ষমতায় আসে অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার। এদিকে, বাংলাদেশে মানবাধিকার নিয়ে যারা কাজ করেন তাদের অনেকে বলছেন, আওয়ামী লীগের সময়ে মানবাধিকার লঙ্ঘনের সবচেয়ে বড় অভিযোগ ছিল গুম ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড নিয়ে। আর অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে সবচেয়ে বড় উদ্বেগের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে 'মব' সন্ত্রাস, গায়েবি মামলা ও সংখ্যালঘু নিপীড়ন। মানবাধিকার ইস্যুতে বাংলাদেশকে সহায়তার জন্য ঢাকায় মানবাধিকার মিশন চালু করতে জাতিসংঘ ও সরকারের মধ্যে সম্প্রতি সমঝোতা হয়েছে। যদিও ধর্মভিত্তিক কিছু দল এর বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে। সরকার অবশ্য বলেছে, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংক্রান্ত বাধ্যবাধকতা পালনে বাংলাদেশকে সহায়তা করাই তাদের এই উদ্যোগের লক্ষ্য।https://bd.usembassy.gov/wp-content/uploads/sites/151/2025/09/2024-Human-Rights-Report.pdf
যুক্তরাষ্ট্রের মানবাধিকার রিপোর্ট ২০২৩
২০২৩ সালে মানবাধিকার চর্চার দেশভিত্তিক প্রতিবেদন: বাংলাদেশ সারসংক্ষেপ এই বছর বাংলাদেশে মানবাধিকার পরিস্থিতির উল্লেখযোগ্য কোনো পরিবর্তন হয়নি। মানবাধিকারের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর নির্ভরযোগ্য প্রতিবেদনের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে: বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডসহ নির্বিচারে বা বেআইনী হত্যা; জোরপূর্বক গুম; সরকার কর্তৃক নির্যাতন বা নিষ্ঠুর, অমানবিক বা অবমাননাকর আচরণ বা শাস্তি; কঠোর/রূঢ় ও জীবনের জন্য হুমকিস্বরূপ কারাগারের অবস্থা; নির্বিচারে গ্রেফতার বা আটক; বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিয়ে গুরুতর সমস্যা; রাজনৈতিক বন্দী বা আটক ব্যক্তি; অন্য দেশে থাকা বা প্রবাসীর বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিকভাবে দমন প্রচেষ্টা; ব্যক্তিগত গোপনীয়তার উপর নির্বিচারে বা বেআইনীভাবে হস্তক্ষেপ করা; কোনো আত্মীয়ের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের প্রেক্ষিতে তার পরিবারের সদস্যদের শাস্তি দেয়া; সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে সহিংসতা বা সহিংসতার হুমকিসহ স্বাধীন মতপ্রকাশ ও গণমাধ্যমের উপর গুরুতর বিধিনিষেধ আরোপ করা, সাংবাদিকদের অযৌক্তিকভাবে গ্রেফতার বা বিচারের আওতায় আনা, সেন্সরশিপ/নিষেধাজ্ঞা দেয়া এবং মত প্রকাশে বাধা দেয়ার জন্য ফৌজদারি মানহানি আইন বলবৎ; ইন্টারনেটের স্বাধীনতা/অবাধ ব্যবহারের উপর জোরালো নিষেধাজ্ঞা আরোপ; শান্তিপূর্ণভাবে সমাবেশ করা ও সংগঠন করার স্বাধীনতার উপর উল্লেখযোগ্যভাবে হস্তক্ষেপ করাসহ বেসরকারি সংস্থা বা এনজিও এবং নাগরিক সমাজের সংগঠনগুলোর সংগঠিত হওয়া, তহবিল বা পরিচালনা করার উপর অত্যধিক কঠোর আইন প্রয়োগ; চলাফেরার স্বাধীনতার উপর বিধিনিষেধ; অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের মাধ্যমে শান্তিপূর্ণভাবে সরকার পরিবর্তন করতে নাগরিকদের অক্ষমতা; রাজনৈতিক কর্মকান্ডে অংশগ্রহণের ক্ষেত্রে গুরুতর এবং অযৌক্তিক বিধিনিষেধ; সরকারের গুরুতর দুর্নীতি; দেশীয় ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলোর উপর কঠোর সরকারি বিধিনিষেধ বা হয়রানি; পারিবারিক ও ঘনিষ্ঠ সঙ্গী দ্বারা সহিংসতা, যৌন সহিংসতা, কর্মক্ষেত্রে সহিংসতা, শিশু, বাল্য ও জোরপূর্বক বিয়ে এবং এই ধরনের অন্যান্য সহিংসতাসহ ব্যাপক জেন্ডার ভিত্তিক সহিংসতা; জাতিগত সংখ্যালঘু গোষ্ঠী কিংবা আদিবাসী জনগোষ্ঠীকে লক্ষ্য করে সহিংসতামূলক অপরাধ করা বা সহিংসতার হুমকি দেয়া; আইন দ্বারা প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে সম্মতিপূর্ণ সমলিঙ্গের যৌন আচরণকে অপরাধ হিসেবে গণ্য করা; নারী সমকামী, পুরুষ সমকামী, উভকামী, হিজড়া/রূপান্তরকামী, ক্যুয়ার, বা আন্তলিঙ্গ ব্যক্তিদের লক্ষ্য করে সহিংসতামূলক অপরাধ করা বা সহিংসতার হুমকি দেয়া; ট্রেড ইউনিয়ন ও শ্রমিকদের স্বাধীনভাবে সংগঠিত হওয়া এবং যৌথ দর কষাকষির অধিকারের উপর উল্লেখযোগ্য বিধিনিষেধ; এবং ঝুঁকিপূর্ণ শিশুশ্রমের অস্তিত্ব থাকা। মানবাধিকার লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে ব্যাপক দায়মুক্তির অনেক খবর জানা গেছে । বেশিরভাগ ক্ষেত্রে সরকার মানবাধিকার লঙ্ঘনকারী কর্মকর্তা বা নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের চিহ্নিত করতে এবং শাস্তি দেওয়ার জন্য বিশ্বাসযোগ্য পদক্ষেপ নেয়নি।
অধ্যায় ১
ব্যক্তির সততার প্রতি শ্রদ্ধা ক. জীবনের মৌলিক অধিকারগুলো কেড়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে স্বেচ্ছাচারিতা এবং অন্যান্য বেআইনী বা রাজনৈতিকভাবে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হত্যাকাণ্ড সরকার বা তার লোকেরা (এজেন্টরা) বিচারবহির্ভূত হত্যাসহ নির্বিচারে বা বেআইনীভাবে হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে এমন ঘটনার কথা জানা গেছে । পুলিশের নীতিমালা অনুযায়ী পুলিশ দ্বারা সংঘটিত মারাত্মক শারীরিক জখম বা মৃত্যুর ঘটনাসহ উল্লেখযোগ্য সকল বলপ্রয়োগের ঘটনার অভ্যন্তরীণ তদন্তের নিয়ম রয়েছে যা সাধারণত একটি পেশাদার ইউনিট দ্বারা সম্পন্ন করা হয়ে থাকে এবং যারা সরাসরি পুলিশের মহাপরিদর্শকের কাছে দায়বদ্ধ। তবে সরকারের পক্ষ থেকে নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের দ্বারা সংঘটিত মোট হত্যাকাণ্ডের কোন সরকারি পরিসংখ্যান প্রকাশ করা হয়নি কিংবা ঘটনাগুলোর তদন্তে কোন ধরনের স্বচ্ছ ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। মানবাধিকার সংগঠনগুলো ঘটনাসমূহের অভ্যন্তরীণ তদন্ত পরিচালনাকারী ইউনিটের কাজের স্বাধীনতা এবং পেশাগত দক্ষতার মান নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছে। তদন্ত সাপেক্ষে সরকারের দিক থেকে অভিযোগ গঠন করা হয়েছে বলে জানা যায় এমন কয়েকটি ক্ষেত্রে যারা দোষী সাব্যস্ত হয়েছেন তারা মূলত প্রশাসনিক শাস্তি পেয়েছেন। আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলো বছরজুড়ে অভিযান পরিচালনা করেছে, তবে সেগুলো মূলত সন্ত্রাসবিরোধী কর্মকাণ্ড এবং মাদক ও অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্রের বিরুদ্ধে ছিল। কিছু কিছু অভিযান, গ্রেফতার ও অন্যান্য আইন প্রয়োগ কার্যক্রম পরিচালনাকালে সন্দেহজনক মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে। আগের বছরের তুলনায় বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড কমেছে। স্থানীয় মানবাধিকার সংস্থা আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক)-এর দেয়া তথ্য মতে জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত কথিত বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডে বা হেফাজতে থাকা অবস্থায় আটজন ব্যক্তি মারা গেছে, যার মধ্যে দুইজন আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সাথে বন্দুকযুদ্ধে এবং তিনজন হেফাজতে নেওয়ার আগে কিংবা হেফাজতে থাকা অবস্থায় শারীরিক নির্যাতনের কারণে মারা গেছে । অন্য একটি স্থানীয় মানবাধিকার সংস্থার মতে, জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বরের মধ্যে কথিত বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের ১২টি ঘটনা ঘটেছিল। যার মধ্যে চারটি আইন প্রয়োগকারী সংস্থার ক্রসফায়ারে, চারজন আইন প্রয়োগকারী কর্মকর্তাদের গুলিতে এবং হেফাজতে থাকা অবস্থায় নির্যাতনের কারণে চারজন মারা গেছে । মার্চ মাসের ২৬ তারিখে সুলতানা জেসমিন র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নের (র্যাব)-এর হেফাজতে থাকা অবস্থায় মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণের কারণে মারা যান। র্যাব কর্মকর্তারা জানান, আটকের সময় তিনি স্ট্রোক করেন এবং পড়ে যান। পরিবারের সদস্যরা এই বর্ণনাকে ঘটনা ধামাচাপা দেওয়ার গল্প হিসেবে অভিহিত করেছেন এবং প্রমাণ হিসেবে মাথায় জখমের কথা বলেছেন। র্যাব ইউনিটের কমান্ডিং অফিসার গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন যে, আর্থিক জালিয়াতির অভিযোগের ভিত্তিতে জেসমিনকে তারা তুলে নিয়ে গিয়েছিল। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন (ডিএসএ)-এর অধীনে জেসমিনের বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলায় “তার ফেসবুক অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করে চাকরিপ্রার্থীদের কাছ থেকে অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার” অভিযোগ করা হয়েছিল। তবে তাকে তুলে নেওয়ার পরদিন পর্যন্ত তা নথিভুক্ত করা হয়নি। হেফাজতে মৃত্যুর বিষয়টি গণমাধ্যমে ব্যাপক প্রচারের পর, হাইকোর্ট এ ঘটনার সাথে জড়িত র্যাব কর্মকর্তাদের বিস্তারিত প্রতিবেদন দাখিল করতে এবং মামলা দায়েরের আগেই র্যাব কেন জেসমিনকে তুলে নিয়েছিল তা ব্যাখ্যা করার নির্দেশ দেয়। মে মাসে সরকার মৃত্যুর ঘটনা তদন্ত করে ১৫ দিনের মধ্যে প্রতিবেদন দেয়ার জন্য একটি কমিটি গঠন করে। কমিটি গত আগস্টে হাইকোর্টে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিলেও প্রতিবেদনটি জনসাধারণের জন্য প্রকাশ করা হয়নি। অক্টোবরে হাইকোর্টের দুই বিচারপতি বলেছিলেন যে প্রতিবেদনটি অস্পষ্ট ছিল এবং তাকে গ্রেফতার ও আটকের পরিস্থিতির পর্যাপ্ত ব্যাখ্যা সেখানে দেয়া হয়নি। বিচারপতিদের মন্তব্যের সময় পর্যন্ত প্রতিবেদনটি প্রকাশ করা হয়নি। মার্চ মাসের ১৮ তারিখ র্যাব কর্মকর্তারা সাদা পোশাকে নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁও উপজেলায় খুনের সন্দেহভাজন আসামিকে গ্রেফতারের চেষ্টাকালে গুলি করে একজনকে হত্যা করে এবং আরেকজনকে আহত করে। প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে, সাদা পোশাকে থাকা ব্যক্তিরা সন্দেহভাজন ব্যক্তিকে আটক করার সময় তাকে নিজেদের পরিচয় দিতে অস্বীকার করেছিল। এই সময়ে অপহৃত হওয়ার ভয়ে সন্দেহভাজন ব্যক্তি ও অন্যান্য প্রতিবেশীরা ঘটনায় হস্তক্ষেপ করার চেষ্টা করে এবং আরো লোকজন এই পরিস্থিতিতে যোগ দিলে র্যাব গুলি চালায় এবং ওই ব্যক্তির পেটে গুলি করে। কর্তৃপক্ষ দাবি করেছে যে “দুর্বৃত্তরা” র্যাব অফিসারদের উপর গুলি চালিয়েছিল, এতে চারজন কর্মকর্তা জখম হয়েছিল এবং তারা “আত্মরক্ষায়” পাল্টা গুলি চালিয়েছিল। প্রত্যক্ষদর্শীরা এই বর্ণনার সাথে দ্বিমত পোষণ করে জানায় যে ওই ব্যক্তিরা নিরস্ত্র ছিল। ২০২২ সালে র্যাব কর্মকর্তাদের দ্বারা শাহীন মিয়া ও মোহাম্মদ রাজুর বিচারবহির্ভূত হত্যাকান্ডের উপর কোন প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়নি। খ. অন্তর্ধান/গুম সরকারি কর্তৃপক্ষ দ্বারা কিংবা তাদের পক্ষ থেকে গুম করার খবর পাওয়া গেছে । মানবাধিকার সংস্থাগুলো এবং গণমাধ্যমে গুম ও অপহরণের সংবাদ অব্যাহতভাবে প্রকাশিত হয়েছে, যা নিরাপত্তা বাহিনীগুলোর দ্বারা সংঘটিত হয়েছে বলে ধারণা করা হয়। একটি স্থানীয় মানবাধিকার সংস্থা দাবী করে যে জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর মাসের মধ্যে ৩২ জন ব্যক্তি বলপূর্বক গুমের শিকার হয়েছে। এই ধরনের ঘটনাগুলো প্রতিরোধ, তদন্ত কিংবা দোষীদের শাস্তি দেওয়ার ব্যাপারে সরকারের দিক থেকে সীমিত পরিসরে উদ্যোগ নেয়া হয়েছিল। নাগরিক সমাজের সংগঠনগুলোর মতে বলপূর্বক গুমের শিকার ব্যক্তিদের বেশিরভাগ সরকার বিরোধী নেতৃবৃন্দ, আন্দোলনকর্মী এবং ভিন্নমতাবলম্বী। কথিত গুমের ঘটনার পর নিরাপত্তা বাহিনীগুলো ঘটনার শিকার কয়েকজনকে অভিযোগ ছাড়াই ছেড়ে দিয়েছে এবং বাকিদের গ্রেফতার করেছে। ফ্রিডম হাউসের ফ্রিডম ইন দ্য ওয়ার্ল্ড ২০২৩ কান্ট্রি রিপোর্ট-এ উল্লেখ করা হয়েছে “আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলো অব্যাহতভাবে বলপূর্বক গুম, গোপন কারাগার ব্যবহার, নির্বিচারে গ্রেফতার ও নির্যাতনসহ মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা চালিয়ে যাচ্ছে।” বলপূর্বক গুমের শিকার ব্যক্তিদের পরিবার বছরজুড়ে তাদের পরিবারের সদস্যদের ফেরত দিতে এবং তাদের অপহরণের সাথে জড়িত আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সদস্যদের বিচার করার জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে। বলপূর্বক গুমের শিকার পরিবারের পক্ষে কর্মরত সংগঠন মায়ের ডাক পথযাত্রা করেছে এবং এক বিবৃতিতে উল্লেখ করেছে যে, তাদের সদস্যরা বলপূর্বক গুমের ঘটনার জন্য কোনও আইনী, প্রশাসনিক বা বিচারিক প্রতিকার পায়নি। ফেব্রুয়ারি মাসে গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন থেকে জানা যায় যে, জাতিসংঘের বলপূর্বক গুম বিষয়ক ওয়ার্কিং গ্রুপ ওয়ার্কিং গ্রুপ অন এনফোর্সড অর ইনভলান্টারি ডিসঅ্যাপিয়ারেন্স (ডব্লিউজিইআইডি) প্রধান র্যাপোটিয়ারসহ জাতিসংঘের অন্যান্য আরো র্যাপোটিয়ার মায়ের ডাক এবং স্থানীয় মানবাধিকার সংস্থা অধিকার-এর হয়রানির বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে ২০২২ সালের ডিসেম্বরে সরকারকে চিঠি পাঠিয়েছিল। মার্চ মাসে সরকার বলপূর্বক গুমের শিকার ২৮ জন ভুক্তভোগীর মামলার বিষয়গুলো কী হয়েছে সেটা দেখছে বলে জানায়; তবে সরকার বলপূর্বক গুমের সংখ্যা বাড়িয়ে জাতিসংঘকে জানানোর জন্য নাগরিক সমাজের সংগঠনগুলোর সমালোচনা করেছে। জুন মাসে বিরোধী দল বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) নেতা সালাহউদ্দিন আহমেদ, যিনি বাংলাদেশে বলপূর্বক গুম হওয়ার পর বৈধ কাগজপত্র ছাড়া আট বছর ধরে ভারতে আটকে ছিলেন, তিনি ভ্রমণের অনুমতিপত্র পেয়ে দেশে ফিরে আসেন। ২০১৫ সালে আহমেদকে ঢাকায় তার বাসা থেকে অপহরণ করা হয়েছিল এবং সীমান্ত পেরিয়ে ভারতে মুক্তি পাওয়ার আগে তিনি দুই মাস নিখোঁজ ছিলেন। গ. নির্যাতন ও অন্যান্য নিষ্ঠুর, অমানবিক কিংবা অবমাননাকর আচরণ বা শাস্তি এবং অন্যান্য ধরনের অপব্যবহার যদিও বাংলাদেশের সংবিধান ও আইনে নির্যাতন এবং অন্যান্য নিষ্ঠুর, অমানবিক বা অবমাননাকর আচরণ বা শাস্তি নিষিদ্ধ কিন্তু স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলো এবং গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য থেকে জানা যায় যে, নিরাপত্তা বাহিনীগুলো — যার মধ্যে রয়েছে গোয়েন্দা সংস্থাসমূহ, পুলিশ ও বেসামরিক আইন প্রয়োগকারী সংস্থায় নিযুক্ত সামরিক সদস্য, তারা এই আচরণের চর্চা করেছেন। আইনের আওতায় একজন ম্যাজিস্ট্রেট সন্দেহভাজন ব্যক্তিকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আইন প্রয়োগকারী সংস্থার হেফাজতে রাখার অনুমতি দিতে পারেন, যা রিমান্ড নামে পরিচিত। রিমান্ডে থাকা অবস্থায় সন্দেহভাজন ব্যক্তিকে একজন আইনজীবীর উপস্থিতি ছাড়াই জিজ্ঞাসাবাদ করা হতে পারে। মানবাধিকার সংস্থাগুলো অভিযোগ করেছে যে, রিমান্ডে অনেক নির্যাতনের ঘটনা ঘটে থাকে। রিমান্ডে নির্যাতনের শিকার ভুক্তভোগী ব্যক্তিদের মধ্যে যারা নির্যাতন ও হেফাজত (প্রতিরোধ) আইনে মামলা দায়ের করেছেন তাদেরকে হয়রানি ও হুমকি দেওয়া হয়েছিল বলে জানা গেছে; আবার কেউ কেউ প্রতিশোধমূলক নির্যাতনের ভয়ে তাদের মামলা প্রত্যাহার করে নিয়েছিলেন। একাধিক সংস্থার মতে নিরাপত্তা বাহিনীগুলো কথিত জঙ্গি এবং বিরোধী দলীয় রাজনৈতিক নেতাদের কাছ থেকে তথ্য সংগ্রহ করার জন্য নির্যাতন করেছিল। তারা নির্যাতনের জন্য লোহার রড দিয়ে মারধর করা, হাঁটুতে গুলি করা বা মারাত্মকভাবে আঘাত করা, বৈদ্যুতিক শক দেয়া, ধর্ষণ ও অন্যান্য যৌন নির্যাতন এবং মৃত্যুদণ্ডের মহড়া আয়োজনের মধ্য দিয়ে ভয় দেখানোর মতো পদ্ধতির আশ্রয়ের নিয়েছিল। সংস্থাগুলো এটাও দাবি করেছে যে নিরাপত্তা বাহিনীগুলো ঘুষ পাওয়ার জন্য কিংবা স্বীকারোক্তি আদায় করতে ব্যাপকভাবে ও নিয়মিত নির্যাতনের সাথে জড়িত হয়েছিল এবং নির্যাতনের কারণে কখনো কখনো মৃত্যুর ঘটনা পর্যন্ত ঘটেছে। নাগরিক সমাজ ও গণমাধ্যমের মতে, নিরাপত্তা বাহিনীগুলোর দায়মুক্তি বড় ধরনের সমস্যা ছিল, যা শুধুমাত্র র্যাব, বর্ডার গার্ডস বাংলাদেশ, পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগ ও অন্যান্য ইউনিটে সীমিত ছিল না। অপরাধের রাজনীতিকরণ, দুর্নীতি এবং জবাবদিহিতার স্বাধীন ব্যবস্থা না থাকা হেফাজতে নির্যাতনসহ দায়মুক্তির ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্যভাবে ভূমিকা রেখেছে। যদিও উল্লেখযোগ্য ক্ষমতার অপব্যবহারের ঘটনাগুলো পুলিশকে অভ্যন্তরীণ তদন্ত করার প্রয়োজন হয় কিন্তু নাগরিক সমাজ সংগঠনগুলো অভিযোগ করেছে যে তদন্তের প্রক্রিয়াগুলো স্বাধীন ছিল না। জুলাই মাসে মানবাধিকার সংস্থা ও গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন থেকে জানা যায় যে কারারক্ষীদের সহায়তায় ঢাকার কাশিমপুর কারাগারে রুনা লায়লাকে একজন সহবন্দী লাঞ্ছিত করেছিল। খবরে প্রকাশিত হয় যে, ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগের যুব শাখার বহিষ্কৃত নেতা শামীমা নূর পাপিয়া লায়লার কাছ থেকে শারীরিকভাবে বলপ্রয়োগের মাধ্যমে টাকা চুরির চেষ্টা চালিয়েছিল। পাপিয়া এবং কারারক্ষীরা লায়লাকে মারধর করেছিল, কাপড় খুলে নগ্ন করে ফেলেছিল, তাকে নর্দমার পানি পান করতে বাধ্য করেছিল এবং পরবর্তীতে তাকে চিকিৎসা দিতে অস্বীকার করেছিল। জুন মাসে গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য থেকে জানা যায় যে, পুলিশ হেফাজতে মারধরের পর একরামুল হোসেন এরশাদ মারা যান। পুলিশ এরশাদকে ৩১ মে গ্রেফতার করেছিল এবং তাকে জুন মাসের ৩ তারিখে হাসপাতালে নিয়ে গেলে সেখানে তাকে মৃত ঘোষণা করা হয়। তার স্বজনরা দাবী করেছেন যে, গ্রেফতারের পর প্রচণ্ড মারধরের কারণে তার মৃত্যু হয়েছিল। এছাড়াও জুন মাসে শরীয়তপুরে বিচার বিভাগের একজন ঊর্ধ্বতন ম্যাজিস্ট্রেট পুলিশকে হেফাজতে থাকা চার অভিযুক্ত ব্যক্তির কাছ থেকে ঘুষ নেওয়ার অভিযোগে দুই পুলিশ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে বলেছিলেন। ভুক্তভোগীরা অভিযোগ করেছিল যে অভিযুক্ত অফিসাররা তাদের চোখ বেঁধে হাতুড়ি দিয়ে পিটিয়েছে এবং প্লায়ার্স দিয়ে তাদের হাত ও পায়ের নখ তুলেছে। কারাগার ও আটক কেন্দ্রের অবস্থা কারাগারগুলোর অবস্থা ছিল ভয়াবহ এবং ধারণক্ষমতার চেয়ে অনেক বেশি বন্দী, অপর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধা, শারীরিক নির্যাতনের কারণে কখনো কখনো জীবনের জন্য হুমকিস্বরূপ ছিল। স্থানীয় মানবাধিকার সংস্থা আসক-এর প্রতিবেদন মতে, কারা হেফাজতে থাকা অবস্থায় ৭৭ জন বন্দী মারা গেছে , যাদের মধ্যে ৪২ জন ছিল বিচারাধীন এবং ৩৫ জন দণ্ডিত আসামী ছিল। সাবেক বন্দীরা জানিয়েছে যে, কয়েকজন কারাবন্দী ব্যক্তি আটক অবস্থায় কারাগারে মারা যাওয়ার পর হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল এবং সেখানে তাদেরকে স্বাভাবিক মৃত্যু হয়েছে বলে ঘোষণা করা হয়েছে। অন্য একটি স্থানীয় মানবাধিকার সংস্থা দাবি করেছে যে জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বরের মধ্যে কারাগারে ৯৪ জন মারা গেছে । অবমাননাকর ভৌত অবকাঠামো: বাংলাদেশ কারা অধিদপ্তর (বিপিডি)-এর দেয়া তথ্য অনুযায়ী সারা দেশের ৬৮টি কারাগারে ৮০,০০০ এরও বেশি কারাবন্দী ছিল যেখানে এই কারাগারগুলোর মোট ধারণক্ষমতা প্রায় ৪২,৬০০ জন বন্দীর। কারাগারের ভেতরের অবস্থা এমনকি প্রায় ক্ষেত্রে একই কারাগার কেন্দ্রের অভ্যন্তরে ভৌত অবস্থাগত ব্যাপক পার্থক্য দেখা যায়। কর্তৃপক্ষ বন্দীদের কাউকে কাউকে উচ্চ তাপমাত্রা, বায়ুচলাচলের দুর্বল ব্যবস্থা এবং অত্যধিক ভীড়ের মধ্যে রেখেছিল। আগস্টে নিয়ন্ত্রক ও অডিটর জেনারেলের কার্যালয় থেকে কারাগারের অবস্থার উপর সংসদে একটি প্রতিবেদন পাঠানো হয়েছিল এবং সেখানে কারাগারের খাবার নির্ধারিত ন্যূনতম পরিমাণের খাবারের চেয়ে কম ছিল বলে উল্লেখ করা হয়েছিল।
প্রশাসন: কারাগারগুলোতে অপরাধীদের ক্ষোভ বা নালিশ জানানোর কোন আনুষ্ঠানিক ব্যবস্থা ছিল না এবং কর্তৃপক্ষ খুব কমই দুর্ব্যবহারের বিশ্বাসযোগ্য অভিযোগের তদন্ত পরিচালনা করে। বন্দীদের অভিযোগ গ্রহণ করার জন্য কারাগারে কোন ন্যায়পাল ছিল না। স্বাধীন মনিটরিং: সরকারি পরিদর্শক এবং ক্ষমতাসীন দলের সাথে সুসম্পর্ক আছে বা সরকারি দলপন্থী বেসরকারি পর্যবেক্ষকদের কারাগার পরিদর্শনের অনুমতি দিয়েছিল সরকার। তবে এই ধরনের পরিদর্শনের উপর কোন প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়নি। ইন্টারন্যাশনাল কমিটি অফ দি রেডক্রস বিপিডি-কে অব্যাহতভাবে সহায়তা করেছে এবং দেশব্যাপী ৬৮টি কারাগারে এই সহায়তা দিয়েছে। বিপিডি-এর তথ্য মতে, জেলা জজ ও ম্যাজিস্ট্রেট বিচারকরা প্রতি মাসে অন্তত একবার কারাগার পরিদর্শন করেন। ঘ. নির্বিচারে গ্রেফতার বা আটক সংবিধানে নির্বিচারে গ্রেফতার এবং আটককে নিষিদ্ধ করা হয়েছে, তবে আইন কর্তৃপক্ষকে ম্যাজিস্ট্রেটের আদেশ বা গ্রেফতারি পরওয়ানা ছাড়াই একজন ব্যক্তিকে গ্রেফতার এবং আটক করার অনুমতি দেয় যদি কর্তৃপক্ষ বুঝতে পারে যে ওই ব্যক্তি নিরাপত্তা এবং জনশৃঙ্খলার জন্য হুমকি তৈরি করতে পারে বা কর্তৃপক্ষ যদি বুঝতে পারে যে ব্যক্তিটি গুরুতর অপরাধের সাথে জড়িত। সংবিধানে একজন ব্যক্তিকে তার গ্রেফতার হওয়া বা তাকে আটক রাখার বৈধতাকে আদালতে চ্যালেঞ্জ করার অধিকার দিয়েছে যদিও বাংলাদেশ সরকার সাধারণত এই ধরনের চাহিদাগুলো পূরণের ব্যবস্থা নেয়নি। কর্তৃপক্ষ প্রায়ই আটক ব্যক্তিদের অবস্থান বা পরিস্থিতি তাদের পরিবার বা আইনজীবীর কাছে প্রকাশ করেনি কিংবা তাদেরকে গ্রেফতার করার বিষয়টিই অস্বীকার করেছে। গ্রেফতারের প্রক্রিয়া এবং আটক ব্যক্তিদের চিকিৎসা সংবিধান অনুযায়ী গ্রেফতার এবং আটকের জন্য গ্রেফতারি পরোয়ানার দরকার রয়েছে বা কোন একটি অপরাধ সংঘটিত হতে যাচ্ছে এমন অবস্থা পর্যবেক্ষণ সাপেক্ষে গ্রেফতার বা আটক করা যাবে; তবে আইনে এই ধরনের সুরক্ষাগুলোর ব্যতিক্রমও অনুমোদন দেয়া হয়েছে। সংবিধানে আটক ব্যক্তিকে অবশ্যই আটক করার ২৪ ঘণ্টার মধ্যে বিচারিক ক্ষমতার অধিকারী বা বিচার বিভাগীয় কর্মকর্তার সামনে হাজির করার বিধান রয়েছে কিন্তু এই বিধান নিয়মিতভাবে পালন করা হয়নি। সরকার বা জেলা ম্যাজিস্ট্রেট একজন ব্যক্তিকে জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকি হতে পারে এমন কাজ করা থেকে বিরত রাখার উদ্দেশ্যে ৩০ দিনের জন্য আটক রাখতে পারে; তবে দেখা গেছে যে, কর্তৃপক্ষ কখনো কখনো আরো দীর্ঘ সময়ের জন্য কাউকে আটক রেখে দায়মুক্তিও পেয়েছে। বাংলাদেশে একটি কার্যকরী জামিন ব্যবস্থা রয়েছে, তবে পুলিশ জামিনে মুক্ত ব্যক্তিকে ভিন্ন কোন অভিযোগে নিয়মিতভাবে পুনঃগ্রেফতার করেছে। যদিও এই বিষয়ে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের নির্দেশনায় নতুন অভিযোগের ক্ষেত্রে ব্যক্তিদের আদালতে হাজির না করে পুনরায় গ্রেফতার নিষিদ্ধ করা হয়েছে। কর্তৃপক্ষ সাধারণত শুধুমাত্র আদালতে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দাখিল করার পরেই বিবাদীর আইনজীবীদের তাদের মক্কেলদের সাথে দেখা করার অনুমতি দিয়েছে, যা কখনো কখনো গ্রেফতারের পর আদালতে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দাখিল করতে কয়েক সপ্তাহ থেকে কয়েক মাস লেগে গিয়েছিল। আটক ব্যক্তিরা আইনত কৌসুলী/আইনজীবীর পরামর্শ পাওয়ার অধিকারী হয় এমনকি তাদের যদি এর জন্য অর্থ দেওয়ার সামর্থ্য নাও থাকে। কিন্তু এই সেবা প্রদানের জন্য রাষ্ট্রের পর্যাপ্ত তহবিল ছিল না। অনেক বন্দীকে আটক কেন্দ্রের বাইরে অন্য কারো সাথে যোগাযোগ করার অনুমতি দেয়া হয়নি। নির্বিচারে গ্রেফতার: নির্বিচারে গ্রেফতারের ঘটনা ঘটেছিল। প্রায়শই এটা করা হয়েছে রাজনৈতিক বিক্ষোভ বা বক্তৃতার সাথে একত্রিতভাবে বা সন্ত্রাসী কার্যকলাপ মোকাবেলায় নিরাপত্তা বাহিনীর ব্যবস্থা গ্রহণের অংশ হিসেবে এবং সরকার সুনির্দিষ্ট অভিযোগ ছাড়াই ব্যক্তিদের আটকে রেখেছিল, কখনো কখনো অন্যান্য সন্দেহভাজনদের সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করার জন্যও ব্যক্তিদের আটকে রাখা হয়েছিল। ১৯৭৪ সালের বিশেষ ক্ষমতা আইনের ব্যাপকতা কাউকে গ্রেফতারের ক্ষেত্রে আইনি ন্যায্যতা দিয়েছে, যা অন্যথায় নির্বিচারে গ্রেফতার হিসেবে বিবেচিত হতো। যেহেতু বিশেষ ক্ষমতা আইনে গ্রেফতারের জন্য অপরাধ আগে সংঘটিত হওয়ার বাধ্যবাধকতাকে অব্যাহতি দেয়া হয়েছে। মানবাধিকার কর্মীরা দাবি করেছেন যে পুলিশ বিরোধী দলীয় নেতা, কর্মী এবং সমর্থকদের লক্ষ্য করে মিথ্যা মামলা তৈরি করেছে এবং সরকার রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বীদের দমন করতে আইন প্রয়োগকারী সংস্থাকে ব্যবহার করেছে। পুলিশ বিরোধী রাজনৈতিক দলের সদস্যদের নির্বিচারে গ্রেফতার অব্যাহত রেখেছিল। আগস্ট মাসে এশিয়ান হিউম্যান রাইটস কমিশন (এএইচআরসি) এবং সিভিকাস মনিটর এক যৌথ বিবৃতিতে গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্যের বরাতে উল্লেখ করে যে জুলাই মাসের শেষ দিকে বিক্ষোভের আগে পুলিশ ৪০০ জনেরও বেশি বিএনপি নেতাকে কারাগারে পাঠিয়েছে। বিবৃতিতে “শান্তিপূর্ণভাবে বিক্ষোভ করার অধিকার চর্চার কারণে যাদেরকে গ্রেফতার করা হয়েছে তাদেরকে অবিলম্বে মুক্তি দেওয়া এবং নিরাপত্তা বাহিনী ও ক্ষমতাসীন দলের কর্মীদের দ্বারা সংঘটিত মানবাধিকার লঙ্ঘন ও অপব্যবহারের দ্রুত স্বাধীন তদন্ত করা”-র জন্য কর্তৃপক্ষের প্রতি আহ্বান জানানো হয়েছিল। শুনানির আগে আটক: আমলাতান্ত্রিক অদক্ষতা, সীমিত সম্পদ, শুনানিপূর্ব বিধিগুলো প্রয়োগে শিথিলতা এবং দুর্নীতির কারণে নির্বিচারে ও দীর্ঘসময় ধরে শুনানিপূর্ব আটকের ঘটনা অব্যাহত ছিল। এমন হওয়ার জন্য আইনজীবীরা আইনের অত্যধিক ব্যবহারকে দায়ী করেছেন যেমন ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন (ডিএসএ), যার মধ্যে এমন ধারা রয়েছে যেখানে জামিনের অনুমতি নেই; যা শুনানির আগে আটকের সংখ্যা বেশি হওয়ার আরেকটি কারণ। কিছু কিছু ক্ষেত্রে শুনানি পূর্ব আটকের মেয়াদকাল ওই অপরাধের জন্য নির্ধারিত সাজার মেয়াদের সমান কিংবা ছাড়িয়ে গেছে। জুলাই মাসে বাংলাদেশের আপিল আদালত খাদিজা কুবরার জামিন ছাড়াই বিচারপূর্ব আটকের মেয়াদ আরও চার মাসের জন্য বাড়িয়েছিল। ১৭ বছর বয়সী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী খাদিজাকে ডিএসএ-এর অধীনে ২০২২ সালের সেপ্টেম্বর মাসে গ্রেফতার করা হয়েছিল ২০২০ সালে তার উপস্থাপনায় একটি ওয়েবিনারে আগত একজন অতিথির শাসক দলের সমালোচনামূলক মন্তব্য করার অভিযোগে। ফেব্রুয়ারিতে হাইকোর্ট খাদিজাকে জামিন দিলেও রাষ্ট্রপক্ষ সেই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আপিল করে। নভেম্বরে তিনি জামিনে মুক্তি পেলেও তার বিরুদ্ধে অভিযোগ বহাল ছিল। ঙ. প্রকাশ্যে ন্যায্য বিচার (পাবলিক ট্রায়াল)-এ অস্বীকৃতি সংবিধানে স্বাধীন বিচার বিভাগের বিধান থাকলেও দুর্নীতি ও রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের কারণে বিচার বিভাগ স্বাধীনভাবে কাজ করার ক্ষেত্রে আপোষ করেছে। সরকার সাধারণত বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও নিরপেক্ষতার প্রতি শ্রদ্ধাশীল ছিল না। নিম্ন আদালতের রায় দেয়া নিয়ে মানবাধিকার পর্যবেক্ষকদের বক্তব্য হলো যে, নিম্ন আদালত প্রায়শ রাজনৈতিক প্রভাব কিংবা আনুগত্যের ভিত্তিতে রায় দিয়েছে, বিশেষ করে যে মামলাগুলো বিরোধী রাজনৈতিক দলের সমর্থকদের বিরুদ্ধে দায়ের করা হয়েছিল। পর্যবেক্ষকরা দাবি করেছেন যে, বিচারকদের মধ্যে যারা সরকারের অনুকূলে সিদ্ধান্ত নেয়নি তারা অন্যত্র বদলির ঝুঁকিতে পড়েছিলেন। পর্যবেক্ষকদের অভিযোগ, ফৌজদারি মামলার ক্ষেত্রে বিচারকরা কখনো কখনো আসামীকে জামিন কিংবা বেকসুর খালাস দেওয়ার জন্য অ্যাটর্নি কিংবা আদালতের অন্যান্য কর্মকর্তাদের কাছ থেকে ঘুষ গ্রহণ করেছেন। দুর্নীতি এবং উল্লেখযোগ্য সংখ্যক মামলার জট লেগে থাকার কারণে আদালত ব্যবস্থা বাধাগ্রস্ত হয়েছিল এবং মামলার শুনানি, বিচার বা কার্যধারা ক্রমাগতভাবে পরবর্তী সময়ের জন্য স্থগিত হওয়ার কারণে বিবাদীপক্ষ বা আসামীদের পক্ষে ন্যায্য বিচার পাওয়া কার্যকরভাবে ব্যাহত হয়েছিল। কিছু ক্ষেত্রে এমন হয়েছে যে, বিচার চলাকালীন আসামীরা যে সময় ধরে হাজতে ছিল সেটা তাদের অপরাধের সর্বোচ্চ হাজতবাসের সাজার চেয়েও বেশি। গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন থেকে জানা যায় যে, জুন মাসে শুধুমাত্র হাইকোর্টে ৫০০,০০০ এরও বেশি মামলা বিচারাধীন ছিল, যার সাথে প্রতি বছর দায়ের করা আরো প্রায় ৯০,০০০ নতুন মামলা যুক্ত হচ্ছে। সুপ্রিম কোর্টের বার্ষিক প্রতিবেদন অনুসারে, হাইকোর্ট ২০১৮ সাল থেকে প্রতিবছর গড়ে ৬৯০টি বিচারাধীন মামলা নিষ্পত্তি করেছে। বিবাদীদের মধ্যে যারা আর্থিক সামর্থ্যের কারণে নিজেদের পক্ষে অ্যাটর্নি বা আইনজীবী নিয়োগ দিতে পারেনি কিংবা আত্মপক্ষ সমর্থন করা থেকে বিরত থাকার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল তারা বিচার চলাকালীন জামিন পাওয়ার যোগ্য হতে পারেনি। জাতীয় আইনগত সহায়তা প্রদান সংস্থা ন্যাশনাল লিগ্যাল এইড সার্ভিসেস অ্যাটর্নি বা উকিল নিয়োগের সামর্থ্য নেই এমন দরিদ্র ও অসহায় বিচারপ্রার্থী জনগণকে কিছু সেবা দিয়েছিল। কিন্তু এই ধরনের সেবা পাওয়ার জন্য অনেক ধরনের আনুষ্ঠানিকতা সারতে হয় যা বোঝা হয়ে দাঁড়ায় এবং এতে দীর্ঘ সময় লেগে যায়। এছাড়াও অনেক বিবাদী এই সেবা সম্পর্কে জানতেন না। বিচারের কার্যপদ্ধতি সংবিধানে জনগণের ন্যায্য ও প্রকাশ্যে বিচার পাওয়ার অধিকারের কথা বলা হলেও বিচার বিভাগ দুর্নীতি, পক্ষপাতিত্ব এবং মানব সম্পদের স্বল্পতার কারণে জনগণের এই অধিকার সবসময় রক্ষা করেনি। আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রসিকিউশন বা মামলার বিচারের সাক্ষীরা প্রায়ই তাদের মৌখিক সাক্ষ্য দেওয়ার জন্য আদালতে উপস্থিত হননি এবং বিচারাধীন মামলার জট সময়মতো সামলানোর জন্য আদালতে বিচারকদের সংখ্যা অপর্যাপ্ত ছিল। বিবাদীরা সময়মতো বিচার পাওয়ার অধিকার পায়নি। দরিদ্র ও অসহায় বিবাদীর সরকারি খরচে উকিল/আইনজীবী পাওয়ার অধিকার থাকলেও অনেক ক্ষেত্রেই দেখা গেছে যে সরকারি খরচে নিযুক্ত বিবাদী পক্ষের সরকারি উকিলরা মামলা পরিচালনার জন্য ভালভাবে প্রস্তুতি নেননি কিংবা মামলার বিষয়বস্তু বিস্তারিতভাবে দেখেননি। বিচার কার্যক্রম বাংলা ভাষায় পরিচালিত হয়েছে এবং যারা বাংলা বুঝতে পারে না কিংবা বলতে পারে না তাদের জন্য সরকার বিনামূল্যে দোভাষীর ব্যবস্থা রাখেনি। সরকার প্রায়শই অভিযুক্ত ব্যক্তিদের অধিকারের প্রতি শ্রদ্ধাশীল ছিল না বিশেষ করে প্রসিকিউশন বা বাদীর সাক্ষীদের মুখোমুখি হওয়ার বা বিরোধীতা করার ক্ষেত্রে এবং তাদের নিজেদের সাক্ষী ও প্রমাণ উপস্থাপনের অধিকারের ক্ষেত্রে। কর্তৃপক্ষ বিবাদীর স্বীকারোক্তি না দেয়া বা দোষ স্বীকার করতে বাধ্য না হওয়ার অধিকারের প্রতি সবসময় শ্রদ্ধাশীল ছিল না এবং যারা স্বীকারোক্তি দেয়নি তাদেরকে প্রায়ই হাজতে রাখা হয়েছিল। বিবাদীদের কেউ কেউ দাবি করেছে যে, পুলিশ অভিযুক্তকে চাপের মুখে স্বীকারোক্তি দেওয়ার জন্য বাধ্য করেছিল। হাইকোর্টের আপিলের রায় নিম্ন আদালত এবং কারা কর্তৃপক্ষকে জানানোর প্রশাসনিক প্রক্রিয়া ছিল খুবই ধীরগতির। সরকারের নির্বাহী বিভাগের ম্যাজিস্ট্রেটদের নেতৃত্বে পরিচালিত ভ্রাম্যমাণ আদালতগুলো তাৎক্ষণিক রায়ে প্রায় ক্ষেত্রে আসামীদের হাজতবাসের রায় দেয়া হয়েছে, যেখানে বিবাদীরা আইনী প্রতিনিধি নিয়োগের সুযোগ পায়নি। অক্টোবরে গণমাধ্যমে প্রকাশিত এক প্রতিবেদন থেকে জানা যায় যে, আদালত ২০১২ সালে দুই সাংবাদিক হত্যা সংক্রান্ত উচ্চ-পর্যায়ের এক মামলার তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার জন্য র্যাবকে অতিরিক্ত সময় মঞ্জুর করেছিল। এটি ছিল তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার সময়সীমা বাড়ানোর ১০৪তম ঘটনা। আইন প্রয়োগকারী কর্মকর্তারা জোড়া খুনের ঘটনায় আটজনকে গ্রেফতার ও তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দাখিল করলেও র্যাব তাদের তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেয়নি। রাজনৈতিক বন্দী ও আটক ব্যক্তি রাজনৈতিক বন্দী বা রাজনীতিকদের আটক থাকার কথা জানা যায়। জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকিস্বরূপ হওয়ার অজুহাতে মিথ্যা অভিযোগসহ রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা প্রায়ই বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর সদস্যদের গ্রেফতার ও বিচারের কারণ হিসেবে দেখা হয়। সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিরোধী রাজনৈতিক দল বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া গৃহবন্দী রয়েছেন। তাকে বিদেশে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা নিতে বাধা দেওয়া হলেও বাংলাদেশী হাসপাতালে তার চিকিৎসা করা হচ্ছে। ২০১৮ সালে খালেদাকে ২০০৮ সালে প্রথম দায়ের করা দুর্নীতি ও তহবিল তছরুপের অভিযোগে ১০ বছরের কারাদণ্ড দেয়া হয়েছিল। তাকে ২০১৯ সালে কারাগার থেকে একটি হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয় এবং ২০২০ সাল থেকে গৃহবন্দি থাকার শর্তে তাকে মুক্তি দেয়া হয়েছিল। আন্তর্জাতিক এবং দেশীয় আইন বিশেষজ্ঞরা দোষী সাব্যস্ত করার ক্ষেত্রে প্রমাণের অভাব উল্লেখ করেছেন এবং প্রধানমন্ত্রী হাসিনার বিরুদ্ধে একাধিক দুর্নীতির অভিযোগ প্রসিকিউটরদের দ্বারা বাদ দেওয়া সত্ত্বেও বিরোধী দলীয় নেতাকে নির্বাচনী প্রক্রিয়া থেকে অপসারণ বা দূরে রাখার জন্য এটিকে একটি রাজনৈতিক চক্রান্ত বলে মত প্রকাশ করেছেন। ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় সংঘটিত যুদ্ধাপরাধ ও নৃশংসতার অভিযোগে অভিযুক্তদের বিচার পরিচালনার জন্য ২০১০ সালে স্থাপিত বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল যুদ্ধের সময় অপরাধের জন্য অভিযুক্তদের মৃত্যুদণ্ডসহ সাজা প্রদান অব্যাহত রেখেছে। অনেক পর্যবেক্ষক এই বিচার কার্যক্রমকে রাজনৈতিকভাবে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হিসেবে দেখছেন কারণ আদালত প্রায় একচেটিয়াভাবে বিরোধী রাজনৈতিক দলের সদস্যদের অভিযুক্ত করেছে। চ. আন্তর্জাতিক দমন-নিপীড়ন সরকার তার সার্বভৌম সীমানার বাইরে থাকা ব্যক্তিদের ভয়ভীতি দেখানো বা প্রতিহিংসামূলক ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য আন্তর্জাতিকভাবে দমন-নিপীড়ন ব্যবস্থাকে ব্যবহার করেছে, যার মধ্যে অভিবাসী জনগোষ্ঠী যেমন রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ, নাগরিক সমাজের আন্দোলনকারী, মানবাধিকার রক্ষাকর্মী এবং সাংবাদিকরা রয়েছেন। হুমকি, হয়রানি, নজরদারি, এবং বলপূর্বক নিয়ন্ত্রণ: সংবাদ মাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, পুলিশ এবং গোয়েন্দা সংস্থাগুলো মানবাধিকার রক্ষাকর্মী, নাগরিক সমাজের নেতৃবৃন্দ এবং দেশের বাইরে অবস্থানরত সরকারের সমালোচকদের পরিবারের সদস্য যারা বাংলাদেশে থাকেন তাদেরকে হয়রানি করা ও তাদের উপর নজরদারি অব্যাহত রেখেছিল। বিদেশে অবস্থানরত সাংবাদিকরা জানিয়েছেন যে তাদের সমালোচনামূলক কার্যক্রম বন্ধ করার জন্য পুলিশ এবং গোয়েন্দা সংস্থাগুলো দেশে থাকা তাদের আত্মীয় স্বজনদের হয়রানি ও ভয়ভীতি দেখানো অব্যাহত রেখেছে। মার্চ মাসে শাসক দলের সাথে যুক্ত চারজন প্রধানমন্ত্রী সম্পর্কে আল-জাজিরার প্রতিবেদন করার প্রতিশোধ হিসেবে লন্ডনভিত্তিক সাংবাদিক জুলকারনাইন সায়ের খানের ভাইকে লোহার রড দিয়ে পিটিয়েছিল । জুলাই মাসে, প্রধানমন্ত্রী বিদেশে থাকা বাংলাদেশী কূটনীতিকদের “রাষ্ট্রবিরোধী” প্রচারণায় লিপ্ত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে “সতর্ক” থাকতে নির্দেশ দিয়েছিলেন যাতে করে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় “বিভ্রান্ত” না হয়। আগস্ট মাসে পুলিশ আনিশা সিদ্দিকাকে নাশকতার ষড়যন্ত্রের অভিযোগে গ্রেফতার ও আটক করে। তাকে আটক করার তিন দিন আগে যুক্তরাষ্ট্রে থাকা তার সন্তান মিশিগান স্টেট ইউনিভার্সিটির স্নাতকের শিক্ষার্থী তানজিলুর রহমানের প্রয়াত যুদ্ধাপরাধী ইসলামী নেতা দেলোয়ার হোসেন সাঈদীর বিচার প্রক্রিয়ার সমালোচনা করে লেখা একটি ফেসবুক পোস্ট ভাইরাল হয়েছিল। একটি আদালত আট দিন পরে তার জামিন মঞ্জুর করে, যদিও প্রথম দু’বার জামিন মঞ্জুরের আবেদন নাকচ করা হয়েছিল। আন্তর্জাতিক আইন প্রয়োগ ব্যবস্থার অপব্যবহার: নির্ভরযোগ্য প্রতিবেদন থেকে জানা যায় যে, সরকার দেশের বাইরে বসবাসরত সুনির্দিষ্ট নাগরিকদের উপর দমন-নিপীড়ন চালানোর লক্ষ্যে আন্তর্জাতিক আইন প্রয়োগ ব্যবস্থা সংশ্লিষ্ট টুলস/আইন অপব্যবহারের চেষ্টা করেছিল। জুলাই মাসে সংবাদ মাধ্যমগুলোতে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে যে, পুলিশ সরকার বিরোধী প্রচারণা চালানোর জন্য ইন্টারপোলের কাছে তিনজন সাংবাদিককে “সাইবার সন্ত্রাসী” হিসেবে চিহ্নিত করে তথ্য দিয়েছিল। দ্বিপাক্ষিক চাপ: নির্ভরযোগ্য তথ্য ছিল যে, সরকার রাজনৈতিকভাবে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হয়ে বিদেশে অবস্থানরত সুনির্দিষ্ট ব্যক্তির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ককে কাজে লাগিয়ে বিভিন্ন দেশের উপর চাপ প্রয়োগ করার চেষ্টা করেছিল। মে মাসে গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন থেকে জানা যায় যে, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশের দূতাবাসগুলোতে বিদেশে “দেশ বিরোধী অপপ্রচার” কর্মকান্ডে লিপ্ত প্রবাসী বাংলাদেশীদের একটি তালিকা পাঠিয়ে তাদের বিরুদ্ধে সম্ভাব্য আইনি ব্যবস্থা নিতে তাদেরকে আশ্রয়দানকারী বিদেশী সরকারের উপর চাপ তৈরির জন্য বলা হয়েছিল। ছ. সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত এবং প্রত্যর্পণ মূল মালিক হিন্দু ব্যক্তিরা ছিল এমন সম্পত্তি ফেরত দেওয়ার লক্ষ্যে প্রণীত ২০০১ সালের অর্পিত সম্পত্তি প্রত্যর্পণ আইন সরকার বাস্তবায়ন করেনি। এই আইন অনুসারে সরকার যাকে রাষ্ট্রের শত্রু বলে ঘোষণা করে তার সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করতে পারে। এটি প্রায়ই দেশ ছেড়ে পালিয়ে যাওয়া বিশেষ করে ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা যুদ্ধের পরে দেশ ছেড়েছে এমন সংখ্যালঘু ধর্মীয় গোষ্ঠীদের পরিত্যক্ত সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করার কাজে ব্যবহৃত হয়। সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীগুলো ভূমির মালিকানা বিরোধ নিয়ে অব্যাহতভাবে অভিযোগ জানাচ্ছে যা তাদেরকে অসমভাবে বাস্তুচ্যুত করছে বিশেষ করে নতুন রাস্তা বা শিল্প উন্নয়ন অঞ্চলগুলোর কাছাকাছি এলাকায়। তারা আরো দাবী করেছে যে, স্থানীয় পুলিশ, বেসামরিক কর্তৃপক্ষ এবং রাজনৈতিক নেতারা কখনো কখনো উচ্ছেদের সাথে জড়িত হচ্ছে কিংবা তারা রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী ভূমি দখলকারীদের বিচার থেকে রক্ষা করছে। যদিও আইন অনুসারে পার্বত্য চট্টগ্রামে বসবাসকারী আদিবাসীদের জমি ফেরত দেয়া যায় কিন্তু বাস্তবে এটি খুব কমই ঘটেছে। জ. ব্যক্তিগত গোপনীয়তা, পরিবার, বসতবাড়ি বা ব্যক্তিগত যোগাযোগ বা চিঠিপত্রের উপর নির্বিচারে স্বেচ্ছাচারী বা বেআইনী হস্তক্ষেপ আইনে ব্যক্তিগত যোগাযোগ বা চিঠিপত্র দেয়া-নেয়ার উপর নির্বিচারে স্বেচ্ছাচারী হস্তক্ষেপ নিষিদ্ধ করা হয়নি। রাষ্ট্রের গোয়েন্দা এবং আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলো স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অনুমতি সাপেক্ষে ব্যক্তিগত যোগাযোগের উপর নজরদারি করতে পারে। তবে পুলিশ ব্যক্তিগত যোগাযোগের উপর নজরদারি করার এই ধরনের অনুমতি আদালতের কাছ থেকে খুব কমই নিয়েছে। মানবাধিকার সংস্থাগুলো অভিযোগ করেছে বাংলাদেশ পুলিশ, জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা সংস্থা, এবং ডিরেক্টরেট জেনারেল অফ ফোর্সেস ইন্টেলিজেন্স (ডিজিএফআই) সরকারের সমালোচক বলে মনে করা হয় এমন নাগরিকদের উপর নজরদারি এবং তাদের ব্যাপারে তথ্য সংগ্রহ করতে ইনফর্মার বা গুপ্তচর নিয়োগ করেছিল। সরকারি কর্তৃপক্ষ বিধি বহির্ভূতভাবে মানুষের বাড়িতে ঢুকেছে বলে খবর পাওয়া গেছে; সুনির্দিষ্ট ব্যক্তিদের ব্যক্তিগত যোগাযোগ উপকরণ বা ব্যক্তিগত তথ্য সংগ্রহ করেছে, তাদের মানবাধিকারের উপর হস্তক্ষেপ করেছে; এবং আত্মীয়দের অপরাধের জন্য পরিবারের সদস্যদের শাস্তি দিয়েছে৷ জানুয়ারি মাসে ইসরায়েলি পত্রিকা হারেৎজ অভিযোগ করে যে দেশটির জাতীয় টেলিযোগাযোগ মনিটরিং সেন্টার একটি ইসরায়েলি কোম্পানির কাছ থেকে গাড়িতে লাগানো যায় এমন নজরদারি করার উপকরণ কিনেছে। যেহেতু দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্ক নেই তাই সাইপ্রাসে নিবন্ধিত একটি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে কেনাকাটা করা হয়েছে বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়।
অধ্যায় ২
নাগরিক স্বাধীনতার প্রতি শ্রদ্ধা ক. মত প্রকাশের স্বাধীনতা; যার মধ্যে সংবাদপত্র ও অন্যান্য গণমাধ্যমের সদস্যরা অন্তর্ভুক্ত সংবিধানে সংবাদপত্র এবং অন্যান্য গণমাধ্যমের সদস্যসহ সকলের মত প্রকাশের স্বাধীনতা দেয়া হয়েছে; কিন্তু সরকার প্রায়ই এই অধিকার লঙ্ঘন করেছে। মত প্রকাশের স্বাধীনতার ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য সীমাবদ্ধতা ছিল। হয়রানি ও প্রতিশোধের ভয়ে গণমাধ্যমকর্মী ও ব্লগাররা সরকারের বিরুদ্ধে সমালোচনা করা থেকে নিজেরাই নিজেদের উদ্যোগে বিরত থেকেছে। মতপ্রকাশের স্বাধীনতা: সংবিধানের সমালোচনাকে সংবিধানে রাষ্ট্রদ্রোহের সমতুল্য করা হয়েছে। রাষ্ট্রদ্রোহের শাস্তি তিন বছর থেকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড পর্যন্ত হতে পারে। আইনে ঘৃণা ছড়ায় এমন বক্তব্য না দেয়ার কথা বলা হলেও ঘৃণাত্মক বক্তৃতা কী তা স্পষ্টভাবে সংজ্ঞায়িত না করার ফলে সরকার বিস্তৃত পরিসরে এর ব্যাখ্যা করার সুযোগ পাচ্ছে। সরকার রাষ্ট্রের নিরাপত্তা বিরোধী বলে বিবেচিত হতে পারে এমন বক্তৃতা নিষিদ্ধ করার পাশাপাশি বিদেশী রাষ্ট্রের সাথে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের বিরুদ্ধে যায় এবং জনশৃঙ্খলা, শালীনতা বা নৈতিকতা বিরোধী বক্তব্যকে নিষিদ্ধ করতে পারে কিংবা যা আদালত অবমাননা, মানহানি বা অপরাধের উস্কানি দেয় এমন বক্তব্য নিষিদ্ধ করতে পারে। আইনে সাংবিধানিক সংস্থাগুলোর যে কোনও সমালোচনাকে অপরাধ বলে গণ্য করা হয়। মূলত সাইবার অপরাধ কমানোর জন্য প্রণীত ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন (ডিএসএ)-এ বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ, জাতীয় সঙ্গীত বা জাতীয় পতাকার বিরুদ্ধে “অপপ্রচার”-এর জন্য যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে। সরকার ডিএসএ আইনকে সরকারের কার্যক্রমের সমালোচনাকারীদের বিরুদ্ধে বছরজুড়ে ব্যাপকভাবে ব্যবহার করেছে। গণমাধ্যম এবং আইনমন্ত্রী সারাদেশে ৭,০০০ এরও বেশি ডিএসএ মামলার কথা জানিয়েছেন। একটি বেসরকারি সংস্থা (এনজিও) জানিয়েছে যে পুলিশ ১৩ থেকে ১৭ বছর বয়সী ২০ জন শিশুর বিরুদ্ধে মামলা করেছে। আইনটি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম, ওয়েবসাইট ও অন্যান্য ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে পাওয়া বক্তব্যের বিরুদ্ধে ব্যবহার করা হয়েছিল যার মধ্যে বিদেশে বসবাসকারী মন্তব্যকারীরাও রয়েছেন। আন্তর্জাতিক অধিকার সংস্থা আর্টিকেল নাইনটিন জানিয়েছে যে ২০২০ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৩ সালের মার্চ পর্যন্ত সময়কালে ২২৯ জন সাংবাদিককে অভিযুক্ত করা হয়েছে এবং ৫৬ জনকে ডিএসএ-এর অধীনে গ্রেফতার করা হয়েছে। সেন্টার ফর গভর্নেন্স স্টাডিজ জানিয়েছে যে, ডিএসএ-এর অধীনে অভিযুক্তদের ২৭ শতাংশ সাংবাদিক। মে মাসে, চরম দারিদ্র্য এবং মানবাধিকার বিষয়ক জাতিসংঘের বিশেষ র্যাপোটিয়ার ভয় ও সেন্সরশিপের পরিবেশ তৈরি করতে ডিএসএ-এর অপব্যবহারের বিষয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তিনি আইনটি অবিলম্বে স্থগিত করার সুপারিশ করে বলেছিলেন যে সাংবাদিক, মানবাধিকার রক্ষাকর্মী, বিরোধী রাজনীতিবিদ এবং শিক্ষাবিদদের মত প্রকাশের স্বাধীনতার অধিকার অনুশীলন ও মতামত প্রকাশের কারণে তাদেরকে ডিএসএ-এর অধীনে আটক করা হয়েছিল। মানবাধিকার সংস্থাগুলো ফেব্রুয়ারিতে সংবাদমাধ্যমে হিন্দু ধর্মাবলম্বী কিশোর বয়সী পরিতোষ সরকারকে ডিএসএ-এর অধীনে ২০২১ সালে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে “ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত” করে এমন পোস্ট করার কারণে আট মাস নির্জন কারাগারে আটক থাকার খবর প্রকাশিত হলে তীব্র প্রতিবাদ করেছিল। কারা কর্তৃপক্ষ পরিতোষ সরকারের পরিবারকে বলেছিল যে তাকে “তার নিরাপত্তার জন্য” জানালাবিহীন নির্জন কারা প্রকোষ্ঠে রাখা হয়েছিল যাতে তার পোস্ট দ্বারা অপমানিত হওয়া স্থানীয় ব্যক্তিরা তার ক্ষতি করতে না পারে। রংপুরের সাইবার ট্রাইব্যুনাল তার জামিন দিতে তিনবার অস্বীকৃতি জানানোর পর শেষ পর্যন্ত ২০২২ সালের মে মাসে জামিন মঞ্জুর করেছে। তবে ফেব্রুয়ারিতে আদালত তার জামিন প্রত্যাহার করে এবং তাকে পুনরায় কারাগারে ফেরত পাঠায়। আগস্ট মাসে সরকার ঘোষণা করে যে তারা সাইবার সিকিউরিটি অ্যাক্ট (সিএসএ) দিয়ে ডিএসএ প্রতিস্থাপন করবে; সংসদে সেপ্টেম্বর মাসে সিএসএ পাস করা হয়। সিএসএ-তে অনেক অপরাধের জন্য শাস্তি কমানো হয়েছে, কিছু অপরাধকে জামিনযোগ্য করা হয়েছে যা আগে ছিল না এবং মানহানির শাস্তি হিসেবে কারাগারে আটক রাখা বাদ দেয়া হয়েছে। তবে সিএসএ-তে ডিএসএ-এর প্রায় সকল ধারাকে রাখা হয়েছে এবং এই আইনেও পুলিশকে পরোয়ানা ছাড়াই অনুসন্ধান, জব্দ করা এবং সন্দেহভাজনকে গ্রেফতার করার ক্ষমতা দেয়া হয়েছে। পর্যবেক্ষকরা অভিযোগ করেছেন যে সিএসএ আগের আইনটিরই নতুন নাম এবং আইনটি বাক স্বাধীনতাকে অপরাধে রূপান্তরীকরণ অব্যাহত রেখেছে। বাতিল করা ডিএসএ আইনের অধীনে শুরু হওয়া মামলাগুলো সিএসএ-এর অধীনে চলতে থাকবে। সহিংসতা এবং হয়রানি: সাংবাদিকরা গোয়েন্দা সংস্থা এবং ক্ষমতাসীন দলের সহযোগী ছাত্র সংগঠনগুলো-সহ সরকারি কর্তৃপক্ষের শারীরিক আক্রমণ, হয়রানি এবং ভয়ভীতির শিকার হয়েছে, বিশেষ করে যখন ডিএসএ-এর সাথে তাদের কাজের কোন যোগসূত্র ছিল। ডিএসএ-কে মানবাধিকার রক্ষাকর্মীরা সাংবাদিকদের ভয় দেখানোর জন্য সরকার এবং ক্ষমতাসীন দলের হাতিয়ার হিসেবে দেখেন। স্বতন্ত্র ব্যক্তিরা গ্রেফতারের হুমকির মুখোমুখি হয়েছেন, তাদেরকে বিচার-শুনানির আগে আটকে রাখা হয়েছিল, তারা ব্যয়বহুল ফৌজদারি বিচারের সম্মুখীন হয়েছেন এবং তারা জরিমানা এবং কারাদণ্ডের পাশাপাশি সামাজিকভাবে হেয় হয়েছেন। আসক জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত সাংবাদিক হয়রানির ১১৯টি ঘটনার কথা জানিয়েছে। অন্য একটি স্থানীয় মানবাধিকার সংস্থা জানুয়ারী থেকে সেপ্টেম্বরের মধ্যে সাংবাদিকদের উপর হামলা বা হয়রানির ৩০৯টি ঘটনার কথা উল্লেখ করেছে, যার মধ্যে ১৩৮ জন সাংবাদিক আহত হয়েছেন। মার্চ মাসের শেষ দিকে ক্ষমতাসীন দলপন্থী একজন আইনজীবী প্রিন্ট, অনলাইন এবং ইলেকট্রনিক মাধ্যম ব্যবহার করে “রাষ্ট্রের ভাবমূর্তি ও সুনাম নষ্ট করা”র অভিযোগে ডিএসএ-এর অধীনে নামকরা সংবাদপত্র প্রথম আলো-এর সম্পাদক ও একজন প্রতিবেদকের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করে। পুলিশ প্রতিবেদক শামসুজ্জামান শামসকে অস্পষ্ট কারণ দেখিয়ে ২০ ঘণ্টা আটক রেখেছিল। দেশের স্বাধীনতার ৫২তম বার্ষিকীতে ২৬ মার্চ প্রথম আলো পত্রিকায় প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনের কারণে পত্রিকার সম্পাদক মতিউর রহমান ও প্রতিবেদক শামসুজ্জামান শামসের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়েছিল। এই পরিস্থিতিতে ডিএসএ-এর বিরুদ্ধে একটি জনরোষ তৈরি হয় এবং শিক্ষার্থী, আইনজীবী, মানবাধিকার কর্মী, নাগরিক সমাজের সংস্থাগুলো, সম্পাদক পরিষদ এবং রাজনৈতিক দলগুলো আইনের সংশোধন বা বাতিলের দাবিতে সারা দেশে বিক্ষোভ করে। জুনে র্যাব জামালপুরে ইউনিয়ন পরিষদের একজন চেয়ারম্যানকে গ্রেফতার করে এবং পুলিশ সাংবাদিক গোলাম রব্বানী নাদিম হত্যার সাথে জড়িত থাকার অভিযোগে আরও কয়েকজনকে গ্রেফতার করে। ১৪ জুন অনলাইন পত্রিকা বাংলানিউজ টোয়েন্টিফোরের সংবাদদাতা এবং একাত্তর টিভির প্রতিনিধি সাংবাদিক নাদিম যখন তার মোটরসাইকেলে বাড়ি যাচ্ছিলেন তখন একদল লোক তার ওপর অতর্কিত হামলা চালায়। তারা নাদিমকে মারধর করে অচেতন অবস্থায় ফেলে রেখে যায়। পথচারীরা তাকে হাসপাতালে নিয়ে যায়। মাথায় গুরুতর আঘাতের কারণে পরের দিন তিনি মারা যান; তার মৃত্যুর পর তার পরিবারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে যে, ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ও ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের সদস্য মাহমুদুল আলম বাবু সম্পর্কে বাংলানিউজ টোয়েন্টিফোরে মে মাসে ধারাবাহিক প্রতিবেদন প্রকাশের জন্য প্রতিশোধ হিসেবে তাকে লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছিল। অনলাইন গণমাধ্যমসহ সংবাদপত্র ও অন্যান্য গণমাধ্যমের সদস্যদের উপর সেন্সরশিপ/ নিষেধাজ্ঞা বা বিষয়বস্তুর উপর বিধিনিষেধ আরোপ করা: মুদ্রিত ও অনলাইন উভয় গণমাধ্যম সক্রিয় ছিল এবং তারা বিভিন্ন ধরনের মতামত প্রকাশ করেছিল। তবে, যারা সরকারের সমালোচনা করেছে তাদের উপর সরকারি চাপ ছিল। গণমাধ্যমগুলো স্বাধীনভাবে বা বিধিনিষেধ ছাড়া চলতে পারেনি। সরকার দেশের সরকারি টেলিভিশনের উপর সম্পাদকীয় নিয়ন্ত্রণ বজায় রেখেছিল এবং বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেলগুলোকে সরকারি কন্টেন্ট বিনামূল্যে প্রচারে নির্দেশনা দিয়েছিল বলে অভিযোগ রয়েছে। এছাড়াও নাগরিক সমাজের সংগঠনগুলো বলেছে যে, বেসরকারি টেলিভিশন সম্প্রচারের লাইসেন্স প্রদান প্রক্রিয়া রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ দ্বারা প্রভাবিত হয়েছিল, যদিও শুধুমাত্র ক্ষমতাসীন দলকে সমর্থন করে এমন বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেলগুলোই সম্প্রচার কার্যক্রম পরিচালনার জন্য লাইসেন্স পেয়েছে। জানুয়ারিতে, সরকার “রাষ্ট্রবিরোধী সংবাদ” প্রকাশ করার অভিযোগে ১৯১টি ওয়েবসাইট বন্ধ করার নির্দেশ দেয়। ফেব্রুয়ারিতে সরকার বাংলা ভাষায় প্রকাশিত একটি সংবাদপত্র এবং প্রধান বিরোধী দল বিএনপির একমাত্র পত্রিকা দৈনিক দিনকাল বন্ধ করে দেয়। ঢাকা জেলা কর্তৃপক্ষ ২০২২ সালের ডিসেম্বর মাসে প্রথমবার সংবাদপত্রটি বন্ধ করার নির্দেশ দিয়েছিল, এই কারণ দেখিয়ে যে সংবাদপত্রটি দেশের মুদ্রণ ও প্রকাশনা আইন লঙ্ঘন করেছে। দৈনিক দিনকাল প্রেস কাউন্সিলে আপিল আবেদন করে তাদের প্রকাশনা অব্যাহত রেখেছিল। পরবর্তীতে কাউন্সিল আপিল আবেদন প্রত্যাখ্যান করে প্রকাশনা বন্ধ করা সংক্রান্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের আদেশ বহাল রাখে। ঢাকাভিত্তিক দুটি সাংবাদিক ইউনিয়ন এক যৌথ বিবৃতিতে জানিয়েছে যে, সিদ্ধান্তটি “বিরোধীকণ্ঠ দমনের প্রতিফলন”। প্রথম আলোর সাংবাদিক রোজিনা ইসলামের বিরুদ্ধে অফিসিয়াল সিক্রেটস অ্যাক্টের মামলা চলমান ছিল। জানুয়ারিতে পুলিশ এই মামলার আরো তদন্ত শুরু করে যদিও ২০২২ সালের অক্টোবরে পুলিশ আদালতে একটি প্রতিবেদন দাখিল করে জানিয়েছিল যে, তার বিরুদ্ধে কোনও প্রমাণ পায়নি। সরকার ২০২১ সালে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় সংশ্লিষ্ট একটি দুর্নীতির সংবাদ অনুসন্ধানকালে মন্ত্রণালয়ের সরকারি নথির ছবি তোলা ও নথি চুরির অভিযোগে রোজিনা ইসলামকে ১৯২৩ সালের অফিসিয়াল সিক্রেটস অ্যাক্ট ও দণ্ডবিধির ধারাগুলোর অধীনে গ্রেফতার করেছিল। রোজিনা ইসলাম দোষী সাব্যস্ত হলে তার ১৪ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড বা মৃত্যুদণ্ড হতে পারে। স্বতন্ত্র ব্যক্তি সাংবাদিক এবং গণমাধ্যমগুলো থেকে অভিযোগ করা হয়েছে যে, গোয়েন্দা সংস্থাগুলো আর্থিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ সরকারি বিজ্ঞাপন বন্ধ করে এবং বেসরকারি কোম্পানিগুলোকে তাদের বিজ্ঞাপন বন্ধ করার জন্য চাপ দিয়ে গণমাধ্যমগুলোকে আংশিকভাবে প্রভাবিত করার চেষ্টা করেছে। সরকার তাদের সমালোচনাকারী বা বিরোধী রাজনৈতিকদের কর্মকাণ্ড ও বক্তব্য প্রচারকারী গণমাধ্যমগুলোকে শাস্তি দিয়েছে। ব্যক্তিগত মালিকানাধীন সংবাদপত্রগুলো রাজনৈতিকভাবে সংবেদনশীল বিষয়বস্তু বা ক্ষমতাসীন দলের সমালোচনামূলক বিষয়গুলোর বাইরে বিভিন্ন ধরনের মতামত প্রকাশ করার ক্ষেত্রে স্বাধীন ছিল। রাজনৈতিক মেরুকরণ এবং সেলফসেন্সরশিপ বা স্ব-আরোপিত নিষেধাজ্ঞা সমস্যা হিসেবে বহাল ছিল। অনুসন্ধানী সাংবাদিকেরা প্রায়ই অভিযোগ করেছেন যে, তাদের ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ ও সম্পাদকরা সরকার ও গোয়েন্দা সংস্থার চাপের ভয়ে তাদের অনুসন্ধানী প্রতিবেদনগুলো “হত্যা” (ছাপায়নি বা প্রকাশ করেনি) করেছে। সাংবাদিকদের কেউ কেউ তাদের অনুসন্ধানী কাহিনী/প্রতিবেদন প্রকাশের পর হুমকি পেয়েছিলেন। সাংবাদিক ও মানবাধিকার সংস্থাগুলোর মতে, নিরাপত্তা বাহিনীর প্রতিশোধ, ডিএসএ-এর অধীনে বিচার এবং রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মামলায় অভিযুক্ত হওয়ার ভয়ে সাংবাদিকরা স্ব-আরোপিত নিষেধাজ্ঞা মেনে চলেছে। যদিও প্রকাশ্যে সরকারের সমালোচনা সাধারণ বিষয় ছিল এবং জনগণ সোচ্চার ছিল, কিছু গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব সরকারের হয়রানির আশঙ্কা প্রকাশ করেছিলেন। লিখিত কুত্সা/অপবাদ আইন: লিখিত কুত্সা, অপবাদ, মানহানি ও ধর্মাবমাননা ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হয়, যা প্রায়শ সরকার, প্রধানমন্ত্রী বা অন্যান্য সরকারি কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে কথা বলা ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে প্রয়োগ করা হয়েছিল। ব্যক্তি ও সংস্থার মানহানি সংক্রান্ত আইনগুলো বিরোধীদলীয় নেতৃবৃন্দ এবং নাগরিক সমাজের সদস্যদের বিচারের জন্য ব্যবহার করা হয়েছিল। সংখ্যালঘুদের অধিকার সংক্রান্ত সংস্থাগুলো ধর্মাবমাননার অজুহাতে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের সদস্যদের ডিএসএ-এর অধীনে নির্বিচারে আটকের সমালোচনা করেছে। জাতীয় নিরাপত্তা: কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে যে জাতীয় ও সাইবার নিরাপত্তা বজায় রাখা এবং সাম্প্রদায়িকতা প্রতিরোধের জন্য ডিএসএ অত্যাবশ্যকীয় এক আইন যদিও আইনটি সরকারের সমালোচনাকারীদের গ্রেফতার বা শাস্তি দিতে কিংবা সরকারি নীতি বা সরকারি কর্মকর্তাদের সমালোচনা প্রতিরোধে ব্যবহার করার অভিযোগ রয়েছে। বেসরকারি প্রভাব: সামাজিক চাপ মত প্রকাশের স্বাধীনতাকে সীমিত করে। নাস্তিক, ধর্মনিরপেক্ষ, ধর্মীয় সংখ্যালঘু এবং নারী সমকামী, পুরুষ সমকামী, উভকামী, হিজড়া/রূপান্তরকামী, ক্যুয়ার এবং আন্তলিঙ্গ (এলজিবিটিকিউআই+) লেখক এবং ব্লগাররা জানিয়েছেন যে, তারা কথিত চরমপন্থী সংগঠনের কাছ থেকে ক্রমাগত মৃত্যুর হুমকি পাচ্ছেন। ইন্টারনেট স্বাধীনতা সরকার ইন্টারনেটে প্রবেশ সীমিত ও ব্যাহত করেছে এবং অসংখ্যবার অনলাইন কন্টেন্ট সেন্সর করেছে। আইনে ভার্চুয়াল প্রাইভেট নেটওয়ার্ক এবং ভয়েস-ওভার-ইন্টারনেট-প্রটোকল টেলিফোন নিষিদ্ধ থাকলেও কর্তৃপক্ষ খুব কমক্ষেত্রেই এই নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করেছে। কয়েকটি ঘটনায় দেখা গেছে যে, সরকার ইন্টারনেট যোগাযোগে হস্তক্ষেপ করেছে, যোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ করছে বা যোগাযোগে বাধা তৈরি করছে, কন্টেন্ট নিয়ন্ত্রণ করছে এবং ওয়েবসাইট বা অন্যান্য যোগাযোগ ব্যবস্থা ও ইন্টারনেট সেবা ব্যবস্থার উপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করছে। অভিযোগ রয়েছে যে, সরকার যে শহরগুলোতে বিরোধী দলগুলো সমাবেশের পরিকল্পনা করেছিল সেই শহরগুলোর ইন্টারনেট সেবা বন্ধ বা ইন্টারনেটের গতি ধীর করে দিয়েছিল। এছাড়াও সরকার অস্পষ্ট মানদণ্ডের ভিত্তিতে কিংবা বিরোধীদের পক্ষে প্রকাশিত বিষয়বস্তু আইনের লঙ্ঘন করেছে দেখিয়ে অনেক ওয়েবসাইট স্থগিত বা বন্ধ করে দিয়েছিল। স্থানীয় এনজিওগুলো সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা, নাগরিক ও রাজনৈতিক প্রতিবাদ এবং নির্বাচনসহ বিভিন্ন পরিস্থিতির কারণে ২০১২ সাল থেকে অন্তত ১৭টি ইন্টারনেট বন্ধের প্রতিবেদন করেছে৷ এক সমীক্ষায় ৮৮ শতাংশ উত্তরদাতা বলেছেন যে, তারা গত তিন বছরে ইন্টারনেট বন্ধের অভিজ্ঞতার শিকার হয়েছেন এবং ৫০ শতাংশ জানিয়েছেন যে, গত এক বছরের মধ্যে তাদের এমন অভিজ্ঞতা হয়েছিল। বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন বাংলাদেশে টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণের জন্য দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থা। এটি আইন প্রয়োগকারী সংস্থা এবং সরকারের অনুরোধে সাড়া দিয়ে ইন্টারনেট সেবাদানকারী সংস্থাগুলোকে কনটেন্ট বা বিষয়বস্তু ব্লক বা আটকে দেওয়ার নির্দেশ দিয়ে থাকে। কমিশন নিয়মিতভাবে সোশ্যাল মিডিয়া কোম্পানিগুলোকে শাসক দলের সমালোচনা করছে বা ধর্মীয় বিশ্বাসের জন্য ক্ষতিকর বিষয়বস্তু সরিয়ে ফেলার নির্দেশ দিয়ে থাকে। সুইডেনভিত্তিক ওয়েবসাইট নেত্র নিউজ সরকারি মন্ত্রীর দুর্নীতির অভিযোগ নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করার পর ২০২০ সাল থেকে ব্লক বা আটকানো আছে। খ. শান্তিপূর্ণ সমাবেশ ও সংগঠন করার স্বাধীনতা সরকার শান্তিপূর্ণ সমাবেশে অংশগ্রহণ ও সমিতি গঠনের স্বাধীনতাকে সীমিত বা নিয়ন্ত্রিত করেছিল। শান্তিপূর্ণ সমাবেশের স্বাধীনতা আইনে শান্তিপূর্ণ সমাবেশে অংশগ্রহণের অধিকারের বিধান থাকলেও সরকার সাধারণভাবে এই অধিকারের প্রতি শ্রদ্ধা দেখায়নি। এই আইনে সরকারকে চারজনের বেশি লোকের সমাবেশ নিষিদ্ধ করার বিস্তৃত পরিসরের বিবেচনাপ্রসূত সিদ্ধান্ত গ্রহণের সুযোগ রাখা হয়েছে। প্রতিবাদ ও বিক্ষোভের মতো সমাবেশের জন্য সরকারের অগ্রিম অনুমতি নেওয়ার প্রয়োজন ছিল। সংবাদপত্রে প্রকাশিত তথ্য থেকে দেখা যায় যে, কর্তৃপক্ষ বিরোধী দলগুলোর সমবেত হওয়াকে ক্রমাগতভাবে বাধা দিয়েছিল এবং অনুমতি দেওয়ার জন্য অযৌক্তিক শর্ত চাপিয়ে দেয়া হয়েছিল। অনেক ক্ষেত্রে পুলিশ এবং বিশেষ করে ক্ষমতাসীন দলের কর্মীরা বিরোধী দল, সংগঠন এবং আন্দোলন-কর্মীদের সমাবেশ ও বিক্ষোভকে ছত্রভঙ্গ করতে বলপ্রয়োগ করেছিল। সরকারি কর্তৃপক্ষ প্রায়ই প্রধান বিরোধী দল বিএনপি এবং অন্যান্য বিরোধী দলকে অনুষ্ঠান করার অনুমতি দিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিল। সরকারি কর্তৃপক্ষ ক্ষমতাসীন দলের কর্মীদের বিরোধী দলের অনুষ্ঠানে তাদের সমর্থকদের ভয় দেখাতে এবং আক্রমণ করতে দিয়েছে। আগস্ট মাসে অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল এবং হিউম্যান রাইটস ওয়াচ ২৮ ও ২৯ জুলাই বিএনপির অবস্থান কর্মসূচির সময় সংঘর্ষের পর বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে অতিরিক্ত শক্তি ব্যবহার বন্ধ করার আহ্বান জানায়। হিউম্যান রাইটস ওয়াচ রিপোর্ট করেছে যে পুলিশ নির্বিচারে রাবার বুলেট, টিয়ার গ্যাস ছুড়েছে এবং জল কামান ব্যবহার করেছে এবং বিক্ষোভের সময় বিরোধী দলের সমর্থকদের লাঠিপেটা করেছে। গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে যে, ১৯ আগস্ট হবিগঞ্জে দলের পথযাত্রা চলাকালে পুলিশের সাথে বিএনপি নেতাকর্মীদের সংঘর্ষে ৩০০ জনেরও বেশি লোক আহত হয়েছিল। বিএনপির মিছিলকারীরা পুলিশকে লক্ষ্য করে ইট-পাটকেল নিক্ষেপ করেছিল বলে অভিযোগ রয়েছে এবং পুলিশ কর্মকর্তারা গুলি চালিয়েছিল এবং কাঁদানে গ্যাস নিক্ষেপ করেছিল। বিএনপি দাবি করেছে যে তাদের নেতাকর্মীরা বুলেটে আঘাতে জখম হয়েছে, কিন্তু পুলিশ দাবি করেছে তারা রাবার বুলেট ছুঁড়েছে। সংগঠন করার স্বাধীনতা আইনে নৈতিকতা বা জনশৃঙ্খলার স্বার্থে “যুক্তিসঙ্গত বিধিনিষেধ” পালন সাপেক্ষে নাগরিকদের সংগঠন তৈরির অধিকার প্রদান করা হয়েছে এবং সরকার সাধারণত নাগরিকদের এই অধিকারকে শ্রদ্ধা করে। আইনে বিভিন্ন এনজিওর বিদেশী তহবিল গ্রহণকে সীমিত করা হয়েছে এবং সংবিধান বা সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান সম্পর্কে অবমাননাকর মন্তব্য করে এমন এনজিওর শাস্তির বিধান করা হয়েছে। সরকারের এনজিও বিষয়ক ব্যুরো প্রায়ই এনজিওর বিদেশী তহবিলের অনুমোদন আটকে রেখেছিল বা অনুমতি দিতে বিলম্ব করেছিল, বিশেষ করে যাদের কাজ এনজিও বিষয়ক ব্যুরো সংবেদনশীল মনে করেছে যেমন, মানবাধিকার, শ্রম অধিকার, আদিবাসীদের অধিকার, এলজিবিটিকিউআই+ অধিকার বা রোহিঙ্গা শরণার্থীদের মানবিক সহায়তার মতো সংবেদনশীল বিষয়গুলোতে যারা কাজ করে। নাগরিক সমাজের অনেক সংস্থা বর্ধিতহারে তদন্ত ও পরীক্ষা-নিরীক্ষা এবং আমলাতান্ত্রিক বিলম্বের সম্মুখীন হওয়ার দাবী করেছিল। আন্দোলন কর্মী এবং স্থানীয় এনজিওগুলো এনজিওর তহবিল সীমিত করা ও অন্যান্য জবরদস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ যেমন ব্যাংক একাউন্ট জব্দ করা, ট্যাক্স বা কর নিরীক্ষা করাসহ ক্রমবর্ধমানভাবে সরকারী যাচাই বাছাই এবং আমলাতান্ত্রিক বিধিনিষেধ এবং বিলম্বের বিষয়টি তুলে ধরেছে। গ. ধর্মীয় স্বাধীনতা স্টেট ডিপার্টমেন্ট-এর ইন্টারন্যাশনাল রিলিজিয়াস ফ্রিডম রিপোর্ট দেখুন। ঘ. স্বাধীনভাবে চলাফেরা করা এবং দেশ ত্যাগ করার অধিকার আইনে রাষ্ট্রের মধ্যে স্বাধীনভাবে চলাফেরা, দেশত্যাগ এবং স্বদেশে প্রত্যাবর্তনের অধিকার প্রদান করা হয়েছে এবং সরকার সাধারণভাবে তিনটি সংবেদনশীল এলাকা ছাড়া এই অধিকারকে শ্রদ্ধা করে। সংবেদনশীল এলাকা তিনটি হলো: পাবর্ত্য চট্টগ্রাম, কক্সবাজারে রোহিঙ্গা শরনার্থী শিবির এবং বঙ্গোপসাগরে অবস্থিত ভাসানচর দ্বীপ। রাষ্ট্রের অভ্যন্তরে চলাফেরা: সরকার বিদেশিদের পার্বত্য চট্টগ্রামে প্রবেশের উপর বিধিনিষেধ প্রয়োগ করে এবং রোহিঙ্গা শরণার্থীদের চলাচল সীমিত রাখা হয়েছিল। কক্সবাজারের শরণার্থী শিবিরগুলো কাঁটাতারের বেড়া দিয়ে ঘেরা ছিল এবং সেখানে কয়েকটি পথচারী চলাচলের গেট রয়েছে যেখান দিয়ে রোহিঙ্গারা ক্যাম্পের মধ্যে বা স্থানীয় জনগোষ্ঠীর মধ্যে চলাচল করেছিল। ভাসানচর একটি দ্বীপ যার সাথে মূল ভূখন্ডের কোন নিয়মিত যোগাযোগ ব্যবস্থা নেই সেখানে ৩০,০০০ এরও বেশি রোহিঙ্গা শরণার্থীকে আশ্রয় দেয়া হয়েছে যারা সরকারের অনুরোধে স্বেচ্ছায় সেখানে স্থানান্তরিত হয়েছে। ভাসানচর বা কক্সবাজারের শরনার্থী শিবির ছেড়ে যাওয়ার চেষ্টাকারী অনেক রোহিঙ্গাকে কর্তৃপক্ষ ধরে বা আটক করে নিবন্ধিত শিবিরে ফেরত পাঠিয়েছে। বিদেশ ভ্রমণ: বিদেশ ভ্রমণের অনুমতি দেওয়া হলেও নাগরিক সমাজের কয়েকজন জ্যেষ্ঠ সদস্য এবং আন্তর্জাতিক এনজিও প্রতিনিধিদের পাশাপাশি বিরোধী রাজনৈতিক দলের সদস্যরা জানিয়েছেন যে, তারা ভিসার জন্য আবেদন করার সময় এবং দেশে ঢুকতে বা দেশ ত্যাগের সময় হয়রানি এবং বিলম্বের শিকার হয়েছেন। সরকার ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা যুদ্ধের সন্দেহভাজন যুদ্ধাপরাধীদের দেশত্যাগে বাধা দিয়েছিল। বেসরকারি মালিকানাধীন ব্যাংকগুলোর সিইওরা জানিয়েছেন যে তাদেরকে সরকারি অনুমতি না নিয়ে দেশত্যাগ করার অনুমতি দেওয়া হয়নি, কখনো কখনো অনুমতি আটকে রাখা হয়েছিল। বিরোধী রাজনৈতিক নেতাদের কেউ কেউ দেশ ছাড়ার চেষ্টায় বিলম্ব ও হয়রানির কথাও জানিয়েছেন। ঙ. শরনার্থীদের নিরাপত্তা সরকার রোহিঙ্গা শরনার্থীদের নিরাপত্তা ও সহায়তা দেওয়ার লক্ষ্যে জাতিসংঘের শরনার্থী বিষয়ক হাইকমিশনার (ইউএনএইচসিআর) এবং অন্যান্য মানবিক সংস্থার সাথে সহযোগিতা করেছিল। বাংলাদেশ শরনার্থী অবস্থা সম্পর্কিত ১৯৫১ সালের শরনার্থী সনদ কিংবা ১৯৬৭ সালের প্রটোকলে স্বাক্ষরকারী দেশ নয়। যে কারণে সরকার দাবি করেছিল যে এই সনদে অন্তর্ভুক্ত শরনার্থীদের মৌলিক অধিকারগুলো সমুন্নত রাখার আইনগত বাধ্যবাধকতা তাদের নেই। ২০১৭ সালে নতুন করে রোহিঙ্গাদের আগমনের আগে বার্মা থেকে ইতোপূর্বে বাংলাদেশে আসা আনুমানিক ৩৩,০০০ নিবন্ধিত রোহিঙ্গা শরণার্থীকে সরকার এবং ইউএনএইচসিআর কক্সবাজারের দুটি সরকারি শিবিরে (কুতুপালং এবং নয়াপাড়া) অস্থায়ী সুরক্ষা এবং মৌলিক সহায়তা প্রদান করে আসছিল। এছাড়াও সেই সময়ে কক্সবাজারে অস্থায়ী বসতিতে থাকা প্রায় ২০০,০০০ কাগজপত্রবিহীন/অ-নিবন্ধিত রোহিঙ্গাকে সরকার এবং আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা সহায়তা দিয়ে আসছিল। ২০১৭ সালে ৭৫০,০০০ এরও বেশি রোহিঙ্গা প্রতিবেশী বার্মায় সংঘটিত গণহত্যা থেকে নিজেদেরকে রক্ষা করতে পালিয়ে বাংলাদেশে নিরাপদ আশ্রয়ের জন্য প্রবেশ করেছিল। নতুন করে আসা রোহিঙ্গাদের কারণে ৩০ সেপ্টেম্বরের হিসেব অনুযায়ী শরনার্থী শিবিরে বসবাসকারী নিবন্ধিত রোহিঙ্গার সংখ্যা ছিল ৯৬৫,৪৬৭ জন। তবে সরকার দাবী করেছে যে রোহিঙ্গা শরনার্থীদের প্রকৃত সংখ্যা ১২ লাখের বেশি হবে। সরকার বার্মা থেকে আগতদের শরণার্থী হিসেবে স্বীকৃতি না দিয়ে তাদেরকে “জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত মিয়ানমারের নাগরিক” হিসেবে উল্লেখ করে থাকে। যদিও সরকার শরণার্থীদের জন্য প্রণীত জাতিসংঘের অনেক প্রতিষ্ঠিত মানদণ্ড মেনে চলে। তবে এক্ষেত্রে একটি উল্লেখযোগ্য ব্যতিক্রম হলো রোহিঙ্গারা সারা দেশে চলাচলের পূর্ণ স্বাধীনতা ভোগ করে না। সরকারি কর্মকর্তারা বলেছেন যে, রোহিঙ্গাদের তাদের নিজ দেশে প্রত্যাবাসনই সরকারের একমাত্র লক্ষ্য, তাদেরকে চলাচলের স্বাধীনতা, মাধ্যমিক পরবর্তী শিক্ষা, বা জীবিকার সুযোগের মতো বিশেষ সুযোগগুলো দেয়ার সামর্থ্য নেই। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সভাপতিত্বে সরকারের ২৫টি মন্ত্রণালয় ও বিভাগের প্রতিনিধিদের নিয়ে গঠিত একটি জাতীয় টাস্কফোর্স রোহিঙ্গাদের বিষয়গুলো সামগ্রিকভাবে দেখাশোনার লক্ষ্যে তত্ত্বাবধান ও কৌশলগত দিকনির্দেশনা দিয়ে থাকে। এক্ষেত্রে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়নের সহায়তায় রোহিঙ্গা বিষয়ক আইনশৃঙ্খলা সমন্বয় ও বজায় রেখেছিল। স্থানীয় পর্যায়ে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের অধীন শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনারের কার্যালয় শরনার্থী শিবিরগুলোর ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে ছিল। ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ভাসানচরে ৩০,৭৪৮ জন রোহিঙ্গা শরণার্থী আশ্রয় নিয়েছিল। গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, সরকার ১০০,০০০ শরণার্থীকে চূড়ান্ত স্থানান্তরের জন্য এই দ্বীপকে প্রস্তুত করতে ৩,১০০ কোটি টাকা খরচ করেছে। ভাসানচর দ্বীপে জাতিসংঘের বর্তমান কার্যক্রম সরকার এবং ইউএনএইচসিআর-এর মধ্যে ২০২১ সালে সম্পাদিত সমঝোতা স্মারকের অধীনে করা হচ্ছে যেখানে এই দ্বীপে জাতিসংঘের কার্যক্রমের মানবিক ও সুরক্ষা কাঠামোর রূপরেখা দেয়া রয়েছে। সমঝোতা স্মারকে ভাসান চরে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের সুরক্ষা এবং সেবার মান উন্নত করার বিধান রাখা হয়েছিল। এতে সেবাগুলো যেমন: শিক্ষা, দক্ষতা এবং বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণ, জীবিকা, স্বাস্থ্যসেবা এবং নিরবচ্ছিন্ন টেলিযোগাযোগের মতো সেবাগুলোতে সম্প্রসারিত প্রবেশাধিকারের প্রস্তাব করা হয়েছে যা বাস্তবায়নে কয়েকটি আন্তর্জাতিক দাতা সংস্থা ২০২৩ সালের জয়েন্ট রেসপন্স প্ল্যানের আওতায় সহায়তা করছিল। জুলাই মাসে হাইকোর্ট আরাকান রোহিঙ্গা সোসাইটি ফর পিস অ্যান্ড হিউম্যান রাইটসের চেয়ারম্যান ও প্রতিষ্ঠাতা মোহাম্মদ মহিব উল্লাহ হত্যায় সন্দেহভাজন একজনের জামিন আবেদন খারিজ করে দেয়। ২০২২ সালে সরকার ২৯ জন রোহিঙ্গার বিরুদ্ধে ২০২১ সালের সেপ্টেম্বরে সংঘটিত হত্যায় জড়িত থাকার অভিযোগ এনেছিল। অক্টোবরে কর্তৃপক্ষ মহিব উল্লাহ হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগে একজন সন্দেহভাজনকে গ্রেপ্তার করে। শরনার্থী হিসেবে আশ্রয় লাভের অধিকার: আইনে আশ্রয় লাভের অধিকার বা শরণার্থী মর্যাদা পাওয়ার অধিকার সমর্থন করে না কিংবা সরকার শরণার্থীদের সুরক্ষা দেয়ার জন্য আনুষ্ঠানিক কোন ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করেনি। তা সত্ত্বেও বাংলাদেশ সরকার দেশে বসবাসরত রোহিঙ্গা শরণার্থীদের উল্লেখযোগ্য সুরক্ষা ও সহায়তা প্রদান করেছে। ২০১৭ সালের আগে সরকার ইউএনএইচসিআর-এর সাথে মিলে দুটি শিবিরের মাধ্যমে নিবন্ধিত শরণার্থীদের অস্থায়ী সুরক্ষা এবং মৌলিক সহায়তা দিয়ে আসছে। ২০১৭ সালের পর আরো ৭৫০,০০০ অতিরিক্ত রোহিঙ্গা শরণার্থী বাংলাদেশে আসার পর সরকার শরণার্থীদের বায়োমেট্রিকভাবে নিবন্ধন করতে শুরু করে এবং তাদেরকে পরিচয়পত্র প্রদান করেছিল। ইউএনএইচসিআর রোহিঙ্গা শিবিরগুলোতে বিবাহ, বিবাহবিচ্ছেদ, জন্ম এবং মৃত্যুর কারণে ব্যক্তিগত এবং পারিবারিক অবস্থার তথ্য নিয়মিতভাবে হালনাগাদ করে থাকে এবং এ লক্ষ্যে তারা নিবন্ধন কেন্দ্রগুলো পরিচালনা করা অব্যাহত রেখেছিল। শরনার্থী ও শরণার্থী হিসেবে আশ্রয়প্রার্থীদের অপব্যবহার/নির্যাতন: শরনার্থী শিবিরগুলোতে নিরাপত্তা নিয়ে উল্লেখযোগ্য উদ্বেগ থাকা সত্ত্বেও সরকার রোহিঙ্গা শরণার্থীদের সুরক্ষা ও সহায়তা প্রদানের ক্ষেত্রে বেশিরভাগ সময় ইউএনএইচসিআর এবং অন্যান্য মানবিক সংস্থার সাথে সহযোগিতা করেছে। পর্যবেক্ষকদের প্রতিবেদনে শিবিরগুলোতে মানব পাচার এবং চোরাচালান একটি সাধারণ ঘটনা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে, অল্প কয়েকটি ঘটনার বিচার হয়েছে। সরকারি কর্মকর্তারা মানব পাচারের শিকার ব্যক্তিদের উদ্ধার করা সাপেক্ষে পাচারের শিকার ভুক্তভোগীদের শিবিরে ফেরত পাঠিয়েছিল। আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর তথ্য মতে শিবিরগুলোতে নারীদের বিরুদ্ধে জেন্ডারভিত্তিক সহিংসতার ঘটনা ঘটেছিল। বছরের প্রথমার্ধের ৮১ শতাংশ মামলা ছিল ঘনিষ্ঠ সঙ্গীর দ্বারা সংঘটিত সহিংসতা। শরনার্থীদের বিরুদ্ধে সংঘটিত অপরাধের জবাবদিহিতা না থাকা একটি সমস্যা ছিল। রোহিঙ্গারা অপরাধের অভিযোগ মোকাবেলা করার জন্য প্রতিটি শিবিরের দায়িত্বপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তাদের (যারা ক্যাম্প ইন চার্জ বা সিআইসি নামেও পরিচিত) উপর নির্ভর করেছিল। সিআইসিরা মূলত স্বায়ত্তশাসিত এবং শিবিরের প্রয়োজনানুযায়ী তারা সাড়া দিয়েছিলেন, যা সকল শিবিরের জন্য একই রকম ছিল না। আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর মতে, সিআইসিদের কেউ কেউ দুর্নীতির দিকে ঝুঁকে ছিলেন। পর্যবেক্ষকদের আরো অভিযোগ রয়েছে যে, সীমান্তরক্ষীদের কেউ কেউ, সামরিক ও পুলিশ কর্মকর্তারা রোহিঙ্গা নারী ও শিশুদের পাচারের সুবিধার্থে “অন্যদিকে তাকিয়ে থাকা” থেকে শুরু করে পাচারকারীদের রোহিঙ্গাদের শিবিরে প্রবেশের অনুমতি দেওয়ার জন্য ঘুষ ও পাচারে প্রত্যক্ষভাবে জড়িত থেকেছিল। এনজিও ফরটিফাই রাইটস আগস্টে জানিয়েছে যে রোহিঙ্গা শিবিরে নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা বাংলাদেশ পুলিশের একটি বিশেষ ইউনিট আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়নের সদস্যরা শরনার্থীদের নির্বিচারে আটক এবং নির্যাতন করেছিল এবং শিবিরের বাসিন্দাদের কাছ থেকে নিয়মতান্ত্রিকভাবে চাঁদাবাজি করে। গণমাধ্যমে প্রকাশিত রিপোর্ট অনুযায়ী, ব্যাটালিয়ন অফিসাররা ক্রসফায়ার বন্দুকযুদ্ধে চার রোহিঙ্গাকে হত্যা করেছিল। পুলিশ এই বছরে শিবিরের বাইরে থেকে অন্তত ৯২৪ রোহিঙ্গাকে আটক করেছে। সংবাদ সূত্রে জানা গেছে যে ১ অক্টোবর পর্যন্ত শিবিরগুলোর মধ্যে সংঘর্ষ বা বন্দুকযুদ্ধে ১৯ জন রোহিঙ্গা নেতা (মাঝি), ১৮ জন গ্যাং সদস্য এবং একজন রোহিঙ্গা স্বেচ্ছাসেবক কর্মীসহ কমপক্ষে ৫৪ জন রোহিঙ্গা নিহত হয়েছে। স্বাধীনভাবে চলাচলের অধিকার: রোহিঙ্গাদের স্বাধীনভাবে চলাফেরার ক্ষেত্রে বিধিনিষেধ ছিল। সরকার এবং ইউএনএইচসিআর-এর মধ্যে ১৯৯৩ সালে সম্পাদিত সমঝোতা স্মারক অনুসারে নিবন্ধিত রোহিঙ্গা শরণার্থীদের সরকারি শিবিরগুলোর বাইরে যাওয়ার অনুমতি নেই। ২০১৭ সালে নতুন করে রোহিঙ্গাদের আগমনের পর উখিয়া ও টেকনাফ উপজেলার বাইরে থেকে নিবন্ধিত শরনার্থী এবং নতুন করে আগত রোহিঙ্গা উভয়েরই চলাচল সীমিত করার জন্য পুলিশ রাস্তায় চেকপয়েন্ট স্থাপন করেছিল। ভাসানচরে অবস্থিত রোহিঙ্গাদের পক্ষে দ্বীপ ছেড়ে বের হয়ে যাওয়ার বা কক্সবাজারের শিবিরে তাদের দাবী মোতাবেক পরিবারের সদস্যদের সাথে দেখা করতে যাওয়ার উপায় ছিল না নেই বললেই চলে। কয়েকটি মানবাধিকার সংগঠন ভাসানচর দ্বীপের পরিস্থিতিকে “আটক” থাকা হিসেবে চিহ্নিত করেছে। সরকার ভাসানচরে থাকা শরনার্থীদের কক্সবাজারের শিবিরগুলোতে থাকা পরিবার সাথে মিলিত হওয়ার জন্য প্রতি মাসে কমপক্ষে দুই বার ভ্রমণের অনুমতি দিয়েছে। রসদ, বাণিজ্য, পারিবারের সাথে মিলিত হওয়া, চিকিৎসা এবং অন্যান্য কারণে মূল ভূখণ্ডের সাথে নিয়মিত ও নির্ভরযোগ্য কোন যোগাযোগ ব্যবস্থা ছিল না। শরণার্থীরা দাতা প্রতিনিধিদের কাছে অভিযোগ করেছে যে কক্সবাজারে যাওয়ার সুযোগের জন্য তাদের প্রায়ই কয়েক মাস পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়েছিল। কারণ শুধুমাত্র “জরুরি” বলে মনে হলেই যাওয়ার অনুমতি পাওয়া যায় এবং সরকার কর্তৃক নিয়োজিত অবৈতনিক রোহিঙ্গা সম্প্রদায়ের নেতাদের কাছ থেকে “জরুরি” প্রয়োজনের প্রত্যয়নপত্র পাওয়ার জন্য ঘুষ দিতে হয় এবং এই প্রত্যয়নপত্র তারা যে ভাসানচরে ফিরে আসবে সেই অভিপ্রায় জানানোর জন্যও প্রয়োজন ছিল। অনেক শিবির কর্তৃপক্ষ তাদের শিবিরগুলোতে হিংসাত্মক সহিংস হামলা, অপহরণ বা তুলে নিয়ে যাওয়া প্রতিরোধে সান্ধ্য আইন বা কারফিউ দেয়ার পাশপাশি আইন প্রয়োগকারীদের দিয়ে টহল চালু করেছিল বিশেষ করে রাতের বেলায়। শিবিরগুলোর নিরাপত্তা আরো বাড়াতে এবং রোহিঙ্গাদের পাচারকারীদের হাত থেকে রক্ষা করার লক্ষ্যে সরকার কক্সবাজারের শিবিরগুলোতে ওয়াচ টাওয়ার ও বেড়া নির্মাণ করেছে। মানবিক সংস্থাগুলি বলেছে যে বেড়া নির্মাণ শরণার্থীদের সেবা সরবরাহে বাধা দিচ্ছে এবং উদ্বাস্তু ও আশ্রয়দানকারী স্থানীয় জনগোষ্ঠীর মধ্যে উত্তেজনা বাড়িয়ে তুলছে। কর্মসংস্থান: এমন নির্ভরযোগ্য তথ্য ছিল যে, সরকার শরণার্থীদের কাজ করার উপর বিধিনিষেধ আরোপ করেছে। সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশে থাকা রোহিঙ্গা শরণার্থীদের স্থানীয়ভাবে কাজ করার অনুমতি না দিলেও সরকার শিবিরের অভ্যন্তরে স্বেচ্ছামূলক কাজ করার জন্য রোহিঙ্গাদের ক্ষুদ্র আকারে বৃত্তি এবং সীমিত আকারে কাজের-বিনিময়ে-নগদ অর্থ কার্যক্রম পরিচালনার অনুমতি দিয়েছিল। জাতীয় টাস্ক ফোর্স অনুমোদিত দক্ষতা উন্নয়ন কাঠামো বার্মার রাখাইন রাজ্যে সাধারণত যে ধরনের জীবিকার সুযোগ আছে তার উপর ভিত্তি করে জাতিসংঘের সহায়তায় রোহিঙ্গা শরণার্থী এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর দক্ষতা এবং প্রশিক্ষণ প্রদানের রূপরেখা দিয়েছে। ভাসানচরে দক্ষতা উন্নয়ন এবং জীবিকার সুযোগ সীমিত থাকলেও এই বছরে তা বৃদ্ধি পেতে দেখা গেছে। চলাচলের বিধিনিষেধ সত্ত্বেও, শরনার্থীদের কেউ কেউ অনানুষ্ঠানিক আর্থিক কর্মকান্ডে অবৈধভাবে কায়িক শ্রমিক হিসেবে কাজ করেছে যেখানে তাদের কেউ কেউ শ্রম পাচারের শিকার হয়েছিল। মৌলিক সেবাগুলো পাওয়া: যদিও সংস্থাগুলো সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ ব্যক্তিদের সহায়তা করতে উল্লেখযোগ্যভাবে প্রচেষ্টা চালিয়েছিল কিন্তু জমির স্বল্পতার কারণে রোহিঙ্গাদের মৌলিক সেবাগুলো দেয়া এখনো একটি প্রধান সমস্যা হিসেবে রয়ে গেছে। এই বছরে তহবিলের ঘাটতির কারণে খাদ্যের রেশনের পরিমাণ একাধিকবার কমানো হয়েছিল যা নাটকীয়ভাবে শরণার্থীদের পর্যাপ্ত এবং পুষ্টিকর খাবার পাওয়া কমিয়ে দিয়েছিল। এতে শিবিরজুড়ে খাদ্য নিরাপত্তাহীনতা বাড়িয়েছে। সরকারি শিক্ষা প্রদান সমস্যা হিসেবে রয়ে গেছে। উচ্চ শিক্ষা বেশিরভাগ জনসংখ্যার নাগালের বাইরে ছিল, কিন্তু জুলাই মাসে ইউনিসেফ বার্মিজ পাঠ্যক্রমের বাস্তবায়ন সম্পন্ন করেছে এবং ৩০০,০০০ এরও বেশি রোহিঙ্গা শিশু কিন্ডারগার্টেন ও ১ম শ্রেণি থেকে ১০ম শ্রেণিতে ভর্তি হয়েছে। সরকার এই কার্যক্রমের বাইরে শিক্ষাদানের বাকি কার্যক্রমগুলো বন্ধ রাখার নীতিতে অটল থেকেছে। সরকারি কর্তৃপক্ষ নিবন্ধিত এবং অনিবন্ধিত রোহিঙ্গাদের নিয়মিতভাবে জনস্বাস্থ্য সেবা পাওয়ার সুযোগ রেখেছে, তবে শিবির থেকে বের হওয়ার জন্য তাদেরকে কর্তৃপক্ষের অনুমতি নিতে হয়েছিল। মানবিক কার্যক্রমে নিয়োজিত অংশীদার সংস্থাগুলো রোহিঙ্গাদের স্বাস্থ্য-পরিচর্যার খরচের সংস্থান করা ও তাদের শিবিরে ফিরে আসা নিশ্চিত করেছিল। স্বাস্থ্য খাত শিবির ও এর আশেপাশের এলাকার স্বাস্থ্য ব্যবস্থার সকল তথ্য সংরক্ষণ করে থাকে। প্রাপ্ত উপাত্ত থেকে দেখা যায় যে, স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা ন্যূনতম প্রয়োজনীয়তা পূরণ করেছিল। ভাসানচরে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা সুবিধা ছিল কিন্তু দ্বিতীয় ও উচ্চস্তরের স্বাস্থ্যসেবা সুবিধা সেখানে ছিল না। ফলে যখনই উন্নতস্তরের স্বাস্থ্যসেবার প্রয়োজন হয়েছে দ্বীপের বাইরে থাকা চিকিৎসা সুবিধাগুলোতে রেফার করা হয়েছিল। কিন্তু স্বাস্থ্যসেবার জন্য রোগীদের মূল ভূখণ্ডে স্থানান্তর করার ক্ষেত্রে দ্বীপ ছেড়ে যাওয়ার প্রয়োজনীয় অনুমতি সংগ্রহ করা, বিরূপ আবহাওয়া পরিস্থিতি এবং নৌকার প্রাপ্যতার অভাবে বাধাগ্রস্ত হয়েছিল। চ. অভ্যন্তরীণভাবে বাস্তুচ্যুত ব্যক্তিদের অবস্থা এবং চিকিত্সা ১৯৭৩ থেকে ১৯৯৭ সাল পর্যন্ত পাবর্ত্য চট্টগ্রামে অভ্যন্তরীণ সশস্ত্র সংঘর্ষ চলাকালে সরকারি নীতির কারণে পার্বত্য চট্টগ্রামে যে সামাজিক উত্তেজনা এবং আদিবাসীদের প্রান্তিকীকরণ শুরু হয়েছিল তা অব্যাহত ছিল। এই নীতিতে পাবর্ত্য চট্টগ্রামে জনসংখ্যার ভারসাম্য পরিবর্তন করে বাঙালিদের সংখ্যাগরিষ্ঠ করার অন্তর্নিহিত উদ্দেশ্য নিয়ে ভূমিহীন বাঙালিদের পার্বত্য চট্টগ্রামে পুনর্বাসিত করা হয়েছিল। পাবর্ত্য চট্টগ্রামে পরিচালিত সাম্প্রতিকতম জাতীয় আদমশুমারি থেকে জানা যায় যে, আদিবাসীরা এখন পার্বত্য চট্টগ্রামের তিনটি জেলার মধ্যে দুটিতে সংখ্যালঘু। পার্বত্য চট্টগ্রামে অভ্যন্তরীণভাবে বাস্তুচ্যুত ব্যক্তিদের (আইডিপি) শারীরিক নিরাপত্তা সীমিত ছিল। আদিবাসী জনগোষ্ঠীর নেতারা বাঙালি সেটেলার/বসতি স্থাপনকারীদের দ্বারা আদিবাসীদের অধিকার ব্যাপকভাবে লঙ্ঘিত হওয়ার কথা বলেছেন যা কখনো কখনো নিরাপত্তা বাহিনী দ্বারা সমর্থিত ছিল। পার্বত্য চট্টগ্রামে আইডিপির সংখ্যা নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। এনজিওগুলোর মতে আইডিপির আনুমানিক সংখ্যা ৫০০,০০০ ছাড়িয়ে যেতে পারে, যার মধ্যে আদিবাসীদের পাশাপাশি আদিবাসী নয় এমন জনগোষ্ঠীও রয়েছে। ২০২০ সালে স্বাধীন পার্বত্য চট্টগ্রাম কমিশন প্রাক্কলন করেছিল যে, এই এলাকায় ৯০,০০০ এর চেয়ে কিছু বেশি আদিবাসী আইডিপি বাস করত। দেশের আইডিপিদের সম্পর্কে আরো তথ্যের জন্য অনুগ্রহ করে অভ্যন্তরীণ বাস্তুচ্যুত পর্যবেক্ষণ কেন্দ্র -এর উপকরণ দেখুন। ছ. রাষ্ট্রবিহীন ব্যক্তি দেশে থাকা রোহিঙ্গারা আইনত বা বাস্তবে রাষ্ট্রবিহীন ছিল। তারা বাংলাদেশের নাগরিকত্ব পেতে পারে না, আবার বার্মার সরকারও তাদেরকে নাগরিক হিসেবে স্বীকৃতি দেয়নি। বাংলাদেশে জন্মগ্রহণকারী প্রত্যেক ব্যক্তি নাগরিকত্ব আইন অনুযায়ী জন্মগতভাবে বাংলাদেশের নাগরিক। এই বিধান রোহিঙ্গাদের জন্য প্রযোজ্য নয়। আইনের ২০০৯ সালের সংশোধনী মোতাবেক বাংলাদেশে জন্মগ্রহণকারী যে কারো মা বা বাবা যদি বাংলাদেশী হয় তাহলে তার নাগরিকত্ব দাবি করার অধিকার রয়েছে। এই সংশোধনীটি ২০০৯ সালের আগে রাষ্ট্রহীন পিতার ঘরে জন্মগ্রহণকারী রোহিঙ্গা শিশুদের ক্ষেত্রে ভূতাপেক্ষভাবে প্রয়োগ করা হয়নি, ফলে এই শিশুরা রাষ্ট্রহীন থেকে গেছে। ২০০৯ সালের সংশোধনী সত্ত্বেও একজন বাংলাদেশী পিতামাতার এবং একজন রোহিঙ্গা পিতামাতার মাধ্যমে জন্মগ্রহণকারী শিশুরা নাগরিক হিসেবে স্বীকৃতি পায়নি এমন ঘটনা ছিল।
অধ্যায় ৩
রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণের স্বাধীনতা সংবিধান নাগরিকদের নির্দিষ্ট সময়ান্তে অনুষ্ঠিত অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনে গোপন ব্যালটের মাধ্যমে এবং সর্বজনীন ও সমান ভোটাধিকারের ভিত্তিতে তাদের সরকার নির্বাচন করার ক্ষমতা প্রদান করেছে। আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের দেয়া তথ্য মতে সাম্প্রতিক নির্বাচনগুলো অবাধ কিংবা সুষ্ঠু কোনটাই ছিল না কারণ নির্বাচনগুলোতে গুরুতর অনিয়মের ঘটনা ঘটেছিল। নির্বাচন এবং রাজনৈতিক অংশগ্রহণ সাম্প্রতিক নির্বাচনে অপব্যবহার বা অনিয়ম: জাতীয় নির্বাচন সুষ্ঠু কিংবা অপব্যবহার ও অনিয়মমুক্ত না হওয়ার বিষয়টি নিয়ে ব্যাপকভাবে প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়েছে। পর্যবেক্ষকরা ২০১৮ সালের সংসদ নির্বাচনকে অবাধ কিংবা সুষ্ঠু কোন হিসেবেই গ্রহণ করেননি এবং ব্যালট বাক্স ভর্তি করা ও বিরোধী পোলিং এজেন্ট ও ভোটারদের ভয় দেখানোসহ নানান অনিয়ম দ্বারা দুষ্ট ছিল বলে তারা মনে করেন। নির্বাচনকালীন প্রচারাভিযান কালে হয়রানি, ভয়ভীতি, নির্বিচারে গ্রেফতার এবং সহিংসতার অনেক বিশ্বাসযোগ্য প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছিল যা বিরোধী প্রার্থী এবং তাদের সমর্থকদের দেখা হওয়া, সমাবেশ করা বা অবাধে প্রচারণা চালানো কঠিন করে তুলেছিল। এই বছর সব সংসদীয় উপনির্বাচন এবং স্থানীয় সরকার নির্বাচনে প্রচারণা চলাকালে ও ভোটদানকালে ভয়ভীতি, অনিয়ম ও সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। ১৭ জুলাই সংসদীয় উপ-নির্বাচনের জন্য প্রচারণা চালাতে গিয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থী এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের তারকা আশরাফুল “হিরো” আলম হামলার শিকার হয়েছিলেন, অভিযোগ রয়েছে যে, আওয়ামী লীগ সমর্থিত কর্মীরা তার উপর আক্রমণ চালিয়েছিল। এই ঘটনায় মামলা করতে গেলে স্থানীয় পুলিশ কর্মকর্তারা হামলাকারীদের বিরুদ্ধে মামলা নিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিল। নির্বাচনের দিন পুলিশ তাকে একটি ভোট কেন্দ্র থেকে বের করে দেয়ার পর এবং উপস্থিত সাংবাদিকদের মতে, তাকে শাসক দলের সমর্থকদের হাত থেকে রক্ষা করতে অস্বীকৃতি জানানোর পর তার উপর আবারো আক্রমণ করা হয়েছিল এবং তাকে হাসপাতালে ভর্তি হতে হয়েছিল। কর্তৃপক্ষ দ্বিতীয় হামলার সাথে জড়িত সন্দেহে ১০ জনকে গ্রেফতার করেছিল। রাজনৈতিক দল এবং রাজনীতিতে অংশগ্রহণ: সরকার বিরোধী দলের নেতাদের বিরুদ্ধে দেওয়ানি ও ফৌজদারি অভিযোগ তৈরি করতে আইন প্রয়োগকারী ব্যবস্থাকে ব্যবহার করেছিল। সংবাদ মাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনগুলো বিএনপি ও অন্যান্য দলের দাবিকে সমর্থন করেছে যে, পুলিশ এই বছর বিএনপির হাজার হাজার সদস্যকে রাজনৈতিক বিক্ষোভ সংক্রান্ত ফৌজদারি অপরাধে অভিযুক্ত করেছে এবং অভিযুক্তদের অনেককে আটক করেছে। মানবাধিকার পর্যবেক্ষকদের দাবী হলো এই অভিযোগগুলোর বেশিরভাগই ভিত্তিহীন। বিরোধী আন্দোলনকর্মীদের বিরুদ্ধে ফৌজদারি অভিযোগ আনা হয়েছিল। আইন প্রয়োগকারী কর্তৃপক্ষের হয়রানির কারণে দেশের বৃহত্তম মুসলিম রাজনৈতিক দল জামায়াতে ইসলামীর (জামায়াত) নেতা ও কর্মীরা স্বাধীনভাবে মত প্রকাশ ও সমাবেশ করার সাংবিধানিক অধিকার চর্চা করতে পারেনি। পুলিশ কয়েক দফায় জামায়াতকে সমাবেশ করার অনুমতি দিয়েছে কিন্তু প্রায় ক্ষেত্রেই অনুমতি অস্বীকৃতি জানিয়েছে। রাজনৈতিক দল হিসেবে নিবন্ধিত না থাকায় জামায়াত প্রার্থীরা জামায়াতের নামে নির্বাচন করতে পারেনি। আওয়ামী লীগ সংশ্লিষ্ট সংগঠনগুলো সুনির্দিষ্টভাবে এর ছাত্র সংগঠন বাংলাদেশ ছাত্রলীগ দায়মুক্তির সুবিধা নিয়ে দেশব্যাপী নির্দলীয় ব্যক্তিদের পাশাপাশি বিরোধী দল ও সরকারের সমালোচক হিসেবে পরিচিত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে সহিংসতা ও ভয়ভীতি দেখিয়েছে। ১০ এপ্রিল জাতীয় সংসদে প্রধানমন্ত্রী দেশের শীর্ষস্থানীয় সংবাদপত্র প্রথম আলোর নিন্দা করার পর আওয়ামী লীগের যুবকর্মীরা সংবাদপত্রের অফিস ভাঙ্গচুর করে এবং এই ঘটনা তারা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে লাইভ স্ট্রিমিং বা সরাসরি সম্প্রচার করেছিল। জুলাই মাসে বিএনপি ও আওয়ামী লীগের একের পর এক সমাবেশে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছিল যখন বিএনপি কর্মীরা প্রধান সড়ক ও ঢাকার প্রবেশপথে অবস্থান কর্মসূচি পালন করার চেষ্টা করেছিল। এই সময়ে তারা পুলিশ ও আওয়ামী লীগের সহযোগী সংগঠনের পক্ষ থেকে ধাওয়ার মুখোমুখি হয়েছিল। এই সময়ে একটি সাধারণ বিষয় লক্ষ্য করা গেছে । পুলিশ বিএনপিকে বিক্ষোভ স্থান সরিয়ে দিয়েছে এবং আওয়ামী লীগ কর্মীদেরকে বিএনপিকে আক্রমণের সুযোগ করে দিয়েছে। জুলাইয়ের সংঘর্ষে বিএনপির কয়েকজন নেতাসহ বহু মানুষ জখমপ্রাপ্ত হন। রাজনৈতিক সমাবেশগুলো অক্টোবরের শেষের দিকে আবারো সহিংসতার রূপ নেয়, কারণ পুলিশ এবং বিএনপি সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষ হয়েছিল, যার ফলে ১৩,৭০০ জনেরও বেশি ব্যক্তিকে গ্রেফতার করা হয়েছিল এবং নভেম্বর পর্যন্ত কমপক্ষে ১৪ জন নিহত হয়। জুন মাসে সংবাদপত্রে প্রকাশিত রিপোর্ট থেকে জানা যায় পুলিশ সদর দপ্তর থেকে দেশব্যাপী থানাগুলোকে মুলতবি থাকা নিষ্ক্রিয় ও পুরনো ফৌজদারি মামলাগুলো দ্রুত সচল করার নির্দেশ দেয়া হয়েছে যাতে জাতীয় নির্বাচনের আগে বিএনপি এবং জামায়াতে ইসলামীর সম্ভাব্য প্রার্থীদের আইনিভাবে বেকায়দায় ফেলা যায়। এর ফলে সম্ভাব্য প্রার্থীরা কয়েক ডজন বা শত শত মামলার সম্মুখীন হয়েছেন বলে জানা গেছে। পুলিশের ৬ জুলাইয়ের একটি সভার কার্যবিবরণী পুলিশ সদর দফতর থেকে ফাঁস হয়ে সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হলে জানা যায় যে, পুলিশ ২০১৩ সাল থেকে দায়ের করা ফৌজদারি মামলায় বিএনপি ও জামায়াত সমর্থকদের জড়ানোর জন্য সারাদেশে পুলিশকে নির্দেশ দিয়েছে — “বিএনপি এবং জামায়াতকে নির্বাচনে অযোগ্য ঘোষণা করতে হবে… বিএনপি এবং জামায়াতের যেসব নেতা নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারেন তারা কোন না কোন মামলার আসামি হয়।” মামলার গতি বাড়ানোর জন্য এবং সাক্ষীদের সাক্ষ্য সমন্বয় করার জন্য পুলিশকে বিচার বিভাগের সাথে সহযোগিতা করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। আগস্ট মাসে হিউম্যান রাইটস ওয়াচ তাদের প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে যে কর্তৃপক্ষ জুলাই মাসের শেষ দিকে বিএনপির সমাবেশের আগের সপ্তাহগুলোতে ১,৫০০ এরও বেশি বিরোধী নেতা ও কর্মীর বিরুদ্ধে নামসহ এবং আরো ১৫,০০০ অজ্ঞাত ব্যক্তির বিরুদ্ধে মামলা করেছে। প্রত্যাশিত নির্বাচনের ৯০ দিনেরও কম সময়ের আগে এবং ঢাকায় বড় রাজনৈতিক সমাবেশের আগে অক্টোবরে বিএনপি দাবি করেছিল যে কর্তৃপক্ষ ১৫ ঘন্টার মধ্যে তাদের দলের ২০০ নেতাকর্মীকে আটক করেছিল। সরকার অনেক ক্ষেত্রে বিরোধী দলগুলোর জনসমাবেশমূলক অনুষ্ঠান আয়োজনের অধিকারে হস্তক্ষেপ করেছে এবং বিরোধী রাজনৈতিক অনুষ্ঠানের সম্প্রচার সীমিত করেছে। গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদ থেকে জানা যায় যে, সরকারী কর্তৃপক্ষ বিরোধী দলের অনুষ্ঠান ও সভা সমাবেশে যোগদান করতে যাওয়া ব্যক্তিদের টেলিযোগাযোগে বাধা দিয়েছে, এমনকি একই দিনে শাসক দলের আয়োজিত সমাবেশগুলো বাধামুক্ত ছিল। নারী এবং প্রান্তিক ও ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর সদস্যদের অংশগ্রহণ: কোনো আইন নারী বা সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর সদস্যদের রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণকে সীমিত করেনি এবং তারা অংশগ্রহণ করেছিলেন। ফ্রিডম হাউজ তাদের বার্ষিক প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে যে, নারীদের বিরুদ্ধে সামাজিক বৈষম্যের পাশাপাশি এলজিবিটিকিউআই+ ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে বৈষম্য তাদের রাজনীতিতে অংশগ্রহণ সীমিত করেছিল। রাজনীতি ও রাষ্ট্রীয় সংস্থাগুলোতে ধর্মীয়, জাতিগত এবং অন্যান্য প্রান্তিক জনগোষ্ঠীগুলির কম প্রতিনিধিত্বের বিষয়টি বহাল ছিল।
অধ্যায় ৪
সরকারি দুর্নীতি আইনে দুর্নীতির জন্য দোষী সাব্যস্ত কর্মকর্তাদের ফৌজদারি দণ্ডের বিধান থাকলেও সরকার এই আইন কার্যকরভাবে প্রয়োগ করেনি। এই বছর সরকারি দুর্নীতির অসংখ্য প্রতিবেদন পাওয়া গেলেও সরকারি কর্মকর্তারা দায়মুক্তির কারণে প্রায়ই দুর্নীতিতে লিপ্ত হয়েছে। দুর্নীতির ঘটনা স্বাধীনভাবে মনিটর ও তদন্ত করতে ২০০৪ সালে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল। যাদের কাজ শুধু ঘুষ, আত্মসাৎ, চাঁদাবাজি, মেধা/বিচক্ষণতার অপব্যবহার এবং অনুপযুক্ত রাজনৈতিক অনুদানে সীমিত না থেকে সামগ্রিকভাবে দুর্নীতির মামলাগুলো তদন্তের দায়িত্ব দেয়া হয়েছিল। স্থানীয় মানবাধিকার সংগঠনগুলো ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মী ও আমলাদের বিরুদ্ধে আনা বেশিরভাগ মামলা থেকে তাদের খালাস পাওয়া এবং বিরোধী দলীয় নেতাদের বিরুদ্ধে আইনী প্রক্রিয়া, তদন্ত ও মামলা দায়ের অব্যাহত থাকার বিষয়গুলো তুলে ধরে দুদকের স্বাধীনতা ও কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী আগস্ট পর্যন্ত দুদকে ৬,৫০০ এর বেশি মামলা নিষ্পত্তির অপেক্ষায় রয়েছে। দুর্নীতি: দুর্নীতি একটি গুরুতর সমস্যা হিসেবে বহাল ছিল। ফ্রিডম হাউসের বার্ষিক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে “দুর্নীতির বিস্তার সর্বব্যাপী এবং দুর্নীতিবিরোধী প্রচেষ্টা রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের কারণে দুর্বল হয়ে পড়েছে।” জানুয়ারিতে দুদক ঢাকার পানি সরবরাহ ও পয়ঃনিষ্কাশন কর্তৃপক্ষের ব্যবস্থাপনা পরিচালক তাকসিম এ খান তার ১৩ বছরের দায়িত্বপালনের মেয়াদকালে যুক্তরাষ্ট্রে ১৪টি বাড়ি ও বেশ কয়েকটি গাড়ি কিনেছেন এমন অভিযোগের ভিত্তিতে তদন্ত শুরু করে। তার বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগে বলা হয়েছে যে, তাকসিম তার বিলাসবহুল কেনাকাটার অর্থায়নের জন্য বিদেশী ঋণের অর্থায়নকৃত প্রকল্প থেকে অর্থ চুরি করেছেন। ফেব্রুয়ারিতে গণমাধ্যমে গাজীপুরের সাবেক মেয়র মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলমের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ সংক্রান্ত একটি সরকারি আভ্যন্তরীণ প্রতিবেদনের ভিত্তিতে খবর প্রকাশিত হয়। তার বিরুদ্ধে আনীত দুর্নীতির অভিযোগগুলোর মধ্যে ছিল অর্থ প্রদান না করে আবর্জনা অপসারণের জন্য অর্থপ্রদান দেখানো, নির্মাণ না করে রাস্তা নির্মাণ প্রকল্প সম্পন্ন করা দেখানো, গাজীপুর সিটি করপোরেশনের কাছে ইজারা প্রদানের অর্থ আত্মসাত্ এবং অনুষ্ঠিত হয়নি এমন জনসমাবেশের জন্য অর্থ খরচ দেখানো। সরকারের এই আভ্যন্তরীণ প্রতিবেদন জনসাধারণের জন্য প্রকাশ করা হয়নি। দেশের দুর্নীতি সম্পর্কে আরো তথ্যের জন্য অনুগ্রহ করে ডিপার্টমেন্ট অফ স্টেট এর ইনভেস্টমেন্ট ক্লাইমেট স্টেটমেন্ট-এ নির্দিষ্ট দেশ সম্পর্কে দেখুন এবং ডিপার্টমেন্ট অফ স্টেটের ইন্টারন্যাশনাল নারকোটিক্স কন্ট্রোল স্ট্র্যাটেজি রিপোর্ট দেখুন, যেখানে আর্থিক অপরাধ সংক্রান্ত তথ্য রয়েছে৷
অধ্যায় ৫
আন্তর্জাতিক ও বেসরকারি সংগঠনের পক্ষ থেকে মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা পর্যবেক্ষণ ও তদন্তের প্রতি সরকারি মনোভাব কয়েকটি দেশীয় এবং আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠন মানবাধিকারের ঘটনা তদন্ত করে ফলাফল প্রকাশ করেছে, তবে তাদেরকে উল্লেখযোগ্য সরকারি বিধিনিষেধের মধ্যে কাজ করতে হয়েছিল। সরকারি কর্মকর্তারা বিরল ক্ষেত্রে তাদের প্রতিবেদন তৈরিতে সহযোগিতা করেছেন ও সাড়া দিয়েছেন বরং তারা কখনো কখনো গুরুত্বপূর্ণ সংগঠন ও অধিকারকর্মীদের নাম উল্লেখ করে মৌখিকভাবে আক্রমণ করেছেন। যদিও মানবাধিকার সংগঠনগুলো প্রায়ই সরকারের তীব্র সমালোচনা করেছিল, তবে তারা স্ব-আরোপিত সেন্সরশিপও বজায় রেখেছিল। পর্যবেক্ষকরা অভিযোগ করেছেন যে সরকার কৌশলগতভাবে নাগরিক সমাজের কার্যকারিতা হ্রাস করেছে। এমনকি ক্ষমতাসীন দলের সাথে সুসম্পর্ক রয়েছে নাগরিক সমাজের এমন সদস্যরাও প্রকাশ্যে সরকারি নীতির সমালোচনা করার জন্য নিরাপত্তা বাহিনীর কাছ থেকে গ্রেফতারের হুমকি পাওয়ার কথা জানিয়েছেন। সরকার ২০২২ সালে মানবাধিকার সংস্থা অধিকার এর নিবন্ধন প্রত্যাখ্যান করার পর থেকে সংগঠনটির তহবিল ও কার্যক্রমের উপর অব্যাহতভাবে বাধা দিয়ে আসছে। সংস্থার কর্মকর্তারা তাদের উপর সরকারি কর্মকর্তা এবং নিরাপত্তা বাহিনীর দ্বারা হয়রানি, ভয়ভীতি এবং নজরদারির কথা বলে আসছেন। ঢাকা সাইবার ট্রাইব্যুনাল অধিকারের সেক্রেটারি আদিলুর রহমান খান এবং পরিচালক নাসিরুদ্দিন এলানের বিরুদ্ধে ২০১৩ সালে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি আইন লঙ্ঘনের কথিত অভিযোগে মামলার শুনানি অব্যাহত রেখেছে। জুলাই মাসে, জাতিসংঘের তিনজন স্পেশাল র্যাপোটিয়ার অধিকারকে হয়রানি বন্ধ করতে এবং যথাযথ প্রক্রিয়ার প্রতি সম্মান নিশ্চিত করার জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছিলেন। তারা এই মামলাকে মানবাধিকার রক্ষক এবং সংস্থাগুলোকে নীরব করার জন্য ফৌজদারি কার্যবিধি ব্যবহারের প্রতীক হিসেবে অভিহিত করেছেন। ১৪ সেপ্টেম্বর ট্রাইব্যুনাল খান এবং এলানকে দোষী সাব্যস্ত করে এবং তাদের প্রত্যেককে দুই বছরের কারাদণ্ড এবং ১০,০০০ টাকা জরিমানা করে। হাইকোর্টে তাদের আপিল ও তারই ধারাবাহিকতায় দেয়া রায়ের প্রেক্ষিতে ১৫ অক্টোবর কর্তৃপক্ষ তাদেরকে জামিনে এক বছরের জন্য মুক্তি দেয় এবং জরিমানা স্থগিত করে। সরকারের চাহিদা অনুযায়ী ধর্মীয় সংগঠনসহ সকল এনজিও-র সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের নিবন্ধন থাকতে হবে। স্থানীয় এবং আন্তর্জাতিক এনজিওগুলো যারা মানবাধিকার বিষয়গুলো নিয়ে কাজ করে তারা দাবী করেছে যে গোয়েন্দা সংস্থাগুলো তাদের উপর নজরদারি করে। সরকার কখনো কখনো প্রকল্প নিবন্ধন বিলম্ব করে, কার্যক্রম বন্ধ রাখার চিঠি দিয়ে এবং ভিসা প্রত্যাখ্যানের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক এনজিওগুলোর কার্যক্রম পরিচালনার সামর্থ্যকে সীমিত করেছে। এনজিও বিষয়ক ব্যুরো বেশ কয়েকটি এনজিও-র প্রকল্প অনুমোদন এবং তহবিল ছাড়ে বাধা দিয়েছে। কয়েকটি এনজিও জানিয়েছে যে তারা সরকারের কাছ থেকে কার্যক্রম বন্ধ বা ধীর করার জন্য অনানুষ্ঠানিকভাবে জানতে পেরেছেন। আবার অন্যরা প্রয়োজনীয় সকল নথিপত্র জমা দেওয়া সত্ত্বেও প্রকল্প অনুমোদন পেতে বারবার আনুষ্ঠানিকভাবে বাধার সম্মুখীন হয়েছিল। কিছু কিছু ক্ষেত্রে শাসন ও অধিকার সংক্রান্ত সংবেদনশীল বিষয়ে কাজ করে এমন এনজিওগুলোর তহবিল ছাড়তে ব্যাংকগুলো অস্বীকার করেছে। দীর্ঘ বিলম্বের কারণে কিছু এনজিও তাদের কর্মীদের বেতন দিতে না পারায় তাদের কার্যক্রম কমিয়ে দিয়েছিল। অধিকার নিয়ে কর্মরত সংস্থাগুলো জানিয়েছে যে, আইনে দেশের সংবিধান, এর প্রতিষ্ঠার ইতিহাস কিংবা সাংবিধানিক সংস্থাগুলো সম্পর্কে “অবমাননাকর” মন্তব্য করে এমন এনজিওগুলোর জন্য শাস্তিমূলক বিধান রাখা হয়েছে। মানবাধিকার রক্ষাকারীদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ: সরকার মানবাধিকার রক্ষাকর্মীদের বিরুদ্ধে অসংখ্য মামলা দায়ের করেছে। মানবাধিকার রক্ষকর্মীরা দাবি করেছেন যে তারা ক্রমাগতভাবে সরকারি নজরদারির মধ্যে ছিলেন এবং তারা ও তাদের পরিবারের সদস্যরা ঘন ঘন হয়রানির শিকার হয়েছিলেন। জুলাই মাসে সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজ দেশে মানবাধিকার রক্ষাকর্মীদের অবস্থা নিয়ে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে। তাতে দেখা যায় যে, জরিপে অংশ নেওয়া অন্তত ৬৫ শতাংশ মানবাধিকার রক্ষাকর্মী বলেছেন, ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগ, আইন প্রয়োগকারী সংস্থা ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলো তাদের কাজে বাধা দিয়েছে। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে যে জরিপকৃতদের মধ্যে ৬২ শতাংশ তাদের কাজের সামগ্রিক পরিবেশকে “খুবই অনিরাপদ” বা “অনিরাপদ” হিসেবে দাবী করেছেন এবং ৪২ শতাংশ আইন প্রয়োগকারী, রাষ্ট্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা ও সরকারি কর্মকর্তাসহ রাষ্ট্রের সাথে সংযুক্ত উত্স থেকে হুমকি, ভয়ভীতি এবং নিপীড়নের কথা উল্লেখ করেছেন। জাতিসংঘ বা অন্যান্য আন্তর্জাতিক সংস্থা: ২০১৩ সাল থেকে সরকার বাংলাদেশে আসার ব্যাপারে জাতিসংঘের ডব্লিউজিইআইডি এর অনুরোধে সাড়া দেয়নি। বাংলাদেশে জাতিসংঘের আবাসিক সমন্বয়কারীর কার্যালয় থেকে জানানো হয়েছে যে, ২০১৭ সাল থেকে জাতিসংঘের বিশেষ র্যাপোটিয়ারদের বাংলাদেশে আসার আরো কয়েকটি অনুরোধ মুলতবি রয়েছে, যার মধ্যে বিচারবহির্ভূত, সংক্ষিপ্ত বা নির্বিচারে মৃত্যুদণ্ড বিষয়ক বিশেষ র্যাপোটিয়ার; শান্তিপূর্ণভাবে সমবেত হওয়া এবং সমিতি গঠনের অধিকার বিষয়ক বিশেষ র্যাপোটিয়ার; এবং সন্ত্রাসবাদ মোকাবেলায় মানবাধিকার ও মৌলিক স্বাধীনতার প্রচার ও সুরক্ষার বিষয়ক বিশেষ র্যাপোটিয়ার-এর বাংলাদেশ সফরের অনুরোধ রয়েছে। জাতিসংঘের কয়েকজন বিশেষ র্যাপোটিয়ার সফর করেছেন, যার মধ্যে মে মাসে সফরে করেন চরম দারিদ্র্য ও মানবাধিকার বিষয়ক র্যাপোটিয়ার এবং জানুয়ারিতে সফরে এসেছিলেন অভিবাসীদের মানবাধিকার বিষয়ক র্যাপোটিয়ার। সরকারি মানবাধিকার সংস্থা: জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের মূল কার্যক্রম হলো মানবাধিকার লঙ্ঘনের তদন্ত করা, আইনের বৈষম্য দূর করা, জনসাধারণকে মানবাধিকার সম্পর্কে সচেতন করা এবং সরকারকে প্রধান প্রধান মানবাধিকার সংক্রান্ত বিষয়ে পরামর্শ দেয়া। বেশিরভাগ মানবাধিকার সংস্থা কমিশনের স্বাধীনতা এবং কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে অভিযোগ করেছিল যে সরকার তাদের রাজনৈতিক এজেন্ডা বাস্তবায়নের জন্য রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে ব্যবহার করছে যার মধ্যে কমিশনও রয়েছে।
অধ্যায় ৬
বৈষম্য এবং সামাজিক নির্যাতন নারী ধর্ষণ এবং পারিবারিক সহিংসতা: আইনে পুরুষদের দ্বারা মেয়ে শিশু ও নারীদের ধর্ষণ এবং স্ত্রীকে শারীরিকভাবে নির্যাতন নিষিদ্ধ করা হয়েছে, কিন্তু আইনে মেয়েশিশু বা নারীর বয়স ১৩ বছরের বেশি হলে বৈবাহিক ধর্ষণকে বাদ দেয়া হয়েছে। দোষী সাব্যস্ত হলে ধর্ষণের শাস্তি হিসেবে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড বা মৃত্যুদণ্ডের বিধান রয়েছে। সরকার এই আইন কার্যকরভাবে প্রয়োগ করেনি। মানবাধিকার সংস্থাগুলো দেখেছে যে, ধর্ষণ বাংলাদেশে এখনো একটি গুরুতর সমস্যা হিসেবে রয়ে গেছে। ধর্ষকদের দিক থেকে ধর্ষণের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছাড়ার হুমকি দিয়ে ধর্ষণের শিকার ভুক্তভোগীকে ব্ল্যাকমেইল করার অভিযোগ ছিল। এই সময়ে দায়মুক্তিসহ যৌন সহিংসতার অনেক ঘটনা ঘটেছিল। ফেব্রুয়ারি মাসে পুলিশ একমাস আগে এক নারীকে গণধর্ষণের অভিযোগে পাঁচজনকে গ্রেফতার করেছিল। সংবাদ মাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য মতে, ধর্ষণের শিকার নারী যে রিকশা ভাড়া করেছিল সেই রিকশাচালক তাকে অপহরণ করে একটি নির্মাণাধীন ভবনে নিয়ে যায় যেখানে পাঁচজনের একটি দল তাকে ধর্ষণ করে। জুলাই মাসে পুলিশ ঢাকায় এক কলেজ ছাত্রীকে ধর্ষণের অভিযোগে এক ব্যক্তিকে আটক করে। পুলিশ সূত্রে জানা যায় যে, অভিযুক্ত ধর্ষক ছাত্রীকে প্রলোভন দেখিয়ে একটি শপিং মলের তৃতীয় তলায় নিয়ে গিয়ে ধর্ষণ করে। ধর্ষণের ঘটনা ব্যবস্থাপনার নির্দেশনা অনুসারে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ঘটনা সংঘটনের স্থান নির্বিশেষে ধর্ষণ বা যৌন নিপীড়ন সম্পর্কিত সকল তথ্য অবশ্যই নথিভুক্ত করবেন। ঘটনা নথিভুক্ত হওয়র ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে রাসায়নিক এবং ডিএনএ পরীক্ষা করতে হবে। নির্দেশনায় আরো বলা হয়েছে প্রতিটি থানায় ধর্ষণ বা যৌন নিপীড়নের শিকার ভুক্তভোগীর মামলা ডিউটি অফিসার কর্তৃক রেকর্ড করার সময় সেখানে অবশ্যই একজন নারী পুলিশ কর্মকর্তা থাকতে হবে। ধর্ষণের শিকার ভুক্তভোগীর জবানবন্দী অবশ্যই একজন আইনজীবী, সমাজকর্মী, সুরক্ষা কর্মকর্তা বা ভুক্তভোগী উপযুক্ত মনে করেন এমন অন্য যেকোন ব্যক্তির উপস্থিতিতে নথিভুক্ত করতে হবে। ভুক্তভোগী প্রতিবন্ধী হলে তার জবানবন্দী নেওয়ার প্রয়োজনে দোভাষীর দরকার হলে সরকারি সহায়তায় দোভাষী ব্যবস্থা করতে হবে এবং ভুক্তভোগীর মেডিকেল পরীক্ষা সঠিক সময়ে করার জন্য তদন্তকারী কর্মকর্তার সাথে একজন নারী পুলিশ কর্মকর্তাকে যেতে হবে। মানবাধিকার পর্যবেক্ষকদের মতে, ধর্ষণের শিকার অনেক ভুক্তভোগী আইনি সেবায় প্রবেশাধিকার না পাওয়ায়, সামাজিক অপবাদ/কলঙ্কের ভয়, আরো হয়রানির ভয় এবং সাক্ষী হাজির করার আইনি প্রয়োজনীয়তা থাকায় ধর্ষণের অভিযোগ করেননি। ধর্ষণের ঘটনা প্রমাণের বোঝা ধর্ষিতার উপর ছিল, তাকে মেডিকেল প্রমাণ ব্যবহার করে ধর্ষণের ঘটনা প্রমাণ করতে হয়েছে। অন্যান্য ধরনের সামাজিক জেন্ডারভিত্তিক সহিংসতা বা হয়রানি: কয়েকটি এনজিও যৌতুক সংক্রান্ত বিরোধের জের ধরে সহিংসতার কথা জানিয়েছে যদিও যৌতুকের দাবি বেআইনি। আইন অনুসারে যৌতুক দাবি করা বা দেয়ার জন্য দোষী সাব্যস্ত হলে পাঁচ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড, জরিমানা বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হতে পারে, কিন্তু এই চর্চা দেশজুড়ে সাধারণ ঘটনা হিসেবে লক্ষ্য করা গেছে। জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর মাস পর্যন্ত সময়কালে আসক নারীর বিরুদ্ধে যৌতুক সংক্রান্ত সহিংসতার ১১৪টি ঘটনার কথা জানতে পেরেছে, যার মধ্যে ৫১ জন নারী যৌতুকের বিরোধের কারণে হত্যার শিকার হয়েছে। জুলাই মাসের শেষ দিকে খুলনায় ফুটবল খেলা অনুশীলনের সময় হাফপ্যান্ট পরার জন্য ছয় ব্যক্তি চার জন নারী ফুটবল খেলোয়াড়কে মারধর করে। ভুক্তভোগীদের একজন হামলাকারীদের বিরুদ্ধে থানায় মামলা করলে অভিযুক্ত হামলাকারীরা নারী খেলোয়াড়দের বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা দায়ের, এসিড হামলা, তাদের পরিবারের সদস্যদের ক্ষতি করা এবং হত্যার হুমকি দিতে থাকে। পুলিশ মূল অভিযুক্ত ব্যক্তিকে গ্রেফতার করে এবং ভুক্তভোগী ও অন্যান্য খেলোয়াড়দের নিরাপত্তা দেয়ার প্রতিশ্রুতি দেয়; যদিও হুমকির কারণে একাডেমির অর্ধেক নারী খেলোয়াড় অনুশীলনে যোগদান করা বন্ধ করে দেয়। আসক এর প্রতিবেদন থেকে জানা যায় জানুয়ারি থেকে আগস্ট মাস পর্যন্ত সময়কালে নারীদের উদ্দেশ্য করে ফতোয়া দেওয়ার পাঁচটি ঘটনা ঘটেছিল। সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের একটি রায়ে শুধুমাত্র ধর্মীয় বিষয় নিষ্পত্তির জন্য ফতোয়া ব্যবহারের অনুমতি দেয়া হয়েছে; ফতোয়াকে শাস্তির ন্যায্যতা দেয়ার জন্য ব্যবহার করা যাবে না কিংবা ফতোয়া ধর্মনিরপেক্ষ আইনকে প্রতিস্থাপন বা অগ্রাহ্য করতে পারবে না। তা সত্ত্বেও কিছু কিছু ক্ষেত্রে ফতোয়ার মাধ্যমে নৈতিকতা স্খলনের অভিযোগ এনে বিচারবহির্ভূত শাস্তির ঘটনা ঘটেছে এবং যা মূলত নারীদের বিরুদ্ধে করা হয়েছে। নারীদের বিরুদ্ধে বিচারের ঘটনা ঘটেছে। এই ধরনের ঘটনায় চাবুক মারা, মারধর করা এবং অন্যান্য ধরনের শারীরিক সহিংসতা অন্তর্ভুক্ত ছিল। আক্রমণকারীরা বেঁচে যাওয়া ব্যক্তিদের মুখে এসিড ছুঁড়ে মেরেছে, মূলত নারীদের মুখে এসিড ছুঁড়ে মারা হয়েছে, এতে নারীদের চেহারা বিকৃত হয়েছে এবং অনেকেই অন্ধ হয়ে গেছে। কিছু কিছু ক্ষেত্রে এসিড আক্রমণগুলো নারীর প্রেম বা বিয়ের প্রস্তাবে রাজী না হওয়া বা জমি বা অন্যান্য অর্থ সংক্রান্ত বিরোধের সাথে সম্পর্কিত ছিল। যদিও ২০০৯ সালের হাইকোর্টের রায় দ্বারা যৌন হয়রানি নিষিদ্ধ করা হয়েছে কিন্তু একাধিক এনজিওর মতে হয়রানির ঘটনা যা “ইভ টিজিং” নামেও পরিচিত সমাজে ব্যাপকভাবে বিরাজমান ছিল। বৈষম্য: সংবিধানের ঘোষণা মতে আইনের দৃষ্টিতে সকল নাগরিক সমান এবং আইনের অধীনে সমান সুরক্ষা পাওয়ার অধিকারী। এছাড়াও সংবিধানে “রাষ্ট্র ও জনজীবনের সর্বক্ষেত্রে” নারীর অধিকার পুরুষদের সমান হওয়ার কথা স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে। এনজিওগুলোর মতে, সরকার সবসময় জেন্ডার সমতা সংক্রান্ত আইন কার্যকরভাবে প্রয়োগ করেনি। নারীরা পরিবার, সম্পত্তি এবং উত্তরাধিকার আইনে পুরুষদের মতো একই আইনি মর্যাদা ও অধিকার ভোগ করেনি। পারিবারিক এবং উত্তরাধিকার আইন ধর্ম অনুসারে ভিন্ন। শ্রম আইন জেন্ডারের ভিত্তিতে মজুরি বৈষম্য নিষিদ্ধ করেছে, কিন্তু এটি শ্রম-সম্পর্কিত অন্যান্য ধরনের বৈষম্য নিষিদ্ধ করেনি। তত্ত্বাবধান এবং ব্যবস্থাপনার পদে নারীদের প্রতিনিধিত্ব কম ছিল এবং তারা অনুরূপ কাজ করেও পুরুষদের তুলনায় কম উপার্জন করেছে। প্রজনন অধিকার: সরকারি কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে জোরপূর্বক গর্ভপাত বা অনিচ্ছাকৃত বন্ধ্যাকরণের কোনো রিপোর্ট পাওয়া যায়নি। সরকারি, এনজিও এবং লাভজনক (বেসরকারি বা প্রাইভেট) ক্লিনিক ও হাসপাতালের মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদী ও স্থায়ী পদ্ধতিসহ গর্ভনিরোধকের সকল পদ্ধতির সেবা সহজলভ্য করা হয়েছে। নিম্ন আয়ের পরিবারগুলো বিনামূল্যে দেয়া সরকারি পরিবার পরিকল্পনা সেবার উপর বেশি নির্ভর করেছিল। সরকারি জেলা হাসপাতালগুলোতে যৌন নিপীড়নের শিকার ভুক্তভোগী ব্যক্তিদের গর্ভনিরোধক সেবা দেয়ার জন্য ক্রাইসিস ম্যানেজমেন্ট সেন্টারগুলো কাজ করেছে। তবে এই সেন্টারগুলো পোস্টএক্সপোজার প্রফিল্যাক্সিস সেবা দেয়নি। সাংস্কৃতিক এবং ধর্মীয় কারণে অনেক নারী তাদের স্বামীর অনুমতি ছাড়া গর্ভনিরোধক সেবা নিতে পারেননি। জাতিসংঘের জনসংখ্যা তহবিলের (ইউএনএফপিএ) স্টেট অফ ওয়ার্ল্ড পপুলেশন ২০২৩ প্রতিবেদনে দাবী করা হয়েছে যে, গর্ভনিরোধক ব্যবহারকারীর হার ৬৪ শতাংশ। তবে তাদের মধ্যে দুই-তৃতীয়াংশ নারীর যৌন ও প্রজনন স্বাস্থ্য এবং অধিকারের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা নেই। জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থার দুর্বলতা, যেমন পল্লী এলাকায় প্রশিক্ষিত সেবাদানকারীর অভাব এবং সরঞ্জামের অভাবের কারণে তথ্য ও সেবা পাওয়ার ক্ষেত্রে অন্যায্য পরিস্থিতি তৈরি করেছিল। ঋতুস্রাবকে ঘিরে আলাপে নিষিদ্ধতা ও একে ঘিরে থাকা ভুল ধারণা ঋতুবতী নারীদের জন্য সামাজিক এবং ধর্মীয় বাধা তৈরি করেছিল। কোন কোন রক্ষণশীল জনগোষ্ঠীতে ঋতুস্রাব চলাকালীন সময়ে দূষণের ভয়ে নারীরা রান্নাঘর ব্যবহার করতে পারে না বা ধর্ম চর্চা করা থেকে বিরত ছিল। নাগরিক সমাজের একটি সংগঠনের অনুমান যে প্রতি চারজন স্কুলগামী মেয়ের মধ্যে একজন ঋতুস্রাবের সময় স্কুলে না গিয়ে বাড়িতে ছিল। গড় মজুরি বা আয়ের তুলনায় ঋতুস্রাব বা মাসিক ব্যবস্থাপনার পণ্যের দাম তুলনামূলকভাবে হওয়ায় নারীদের কেউ কেউ মাসিকের সময় অস্বাস্থ্যকর উপকরণ ব্যবহার করেছে। নাগরিক সমাজের সংগঠনগুলো জানিয়েছে যে, যাদের বাল্যবিয়ে হয়েছে তাদের পরিবার পরিকল্পনা পদ্ধতি বাছাই করার ক্ষমতা কম ছিল। এলজিবিটিকিউআই+ গোষ্ঠীগুলোর কাছ থেকে জানা গেছে যে পুরুষ নন এমন ব্যক্তিরা আইনি, সাংস্কৃতিক এবং সামাজিক বাধার সম্মুখীন হয়েছিল যা তাদের যৌন ও প্রজনন স্বাস্থ্য সেবাগুলো পাওয়ার ক্ষেত্রে বাধা হয়েছিল। তাদের স্বাস্থ্যসেবা পাওয়ার অনুমোদন পেতে অনেকসময় তৃতীয় পক্ষের উপস্থিতি দরকার হয়েছিল যেমন একজন স্বামী/স্ত্রী বা পুরুষ অভিভাবক। স্বাস্থ্যসেবাদানকারীদের অনেকে যৌন ক্রিয়াকলাপ নিয়ে আলোচনায় অস্বস্তি প্রকাশ করেছেন এবং যৌন সংক্রামিত রোগ নিয়ে আলোচনাকালে রোগীদের লজ্জা দিয়েছেন। বিশেষ করে নারীদের যৌন সমস্যা নিয়ে আলোচনা ট্যাবু বা এক ধরনের নিষিদ্ধতা ছিল। নাগরিক সমাজের সংগঠনগুলো এবং এলজিবিটিকিউআই+ আন্দোলনকারীরা প্রায়ই এইচআইভি ও এইডস নিয়ে সামাজিক অপবাদের কথা বলেছেন এবং তারা উচ্চ-ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠী বিশেষ করে হিজড়া রূপান্তকামীদের স্বাস্থ্যসেবা পাওয়ার ক্ষেত্রে বাধার কথা উল্লেখ করেছেন। পদ্ধতিগতভাবে বর্ণগত বা জাতিগত সহিংসতা এবং বৈষম্য আইন কোন কোন ক্ষেত্রে প্রান্তিক জাতিগোষ্ঠী বা জাতিগত সম্প্রদায়ের সদস্যদের সুরক্ষা দিলেও এই ধরনের আইনের প্রয়োগ খুব কমই হয়েছে। এনজিওগুলো রিপোর্ট করেছে যে, ধর্ম, বর্ণ ও জাতিগত কারণে সংখ্যালঘুরা বৈষম্যের সম্মুখীন হয়েছিল৷ উদাহরণস্বরূপ, দলিতদের (সর্বনিম্ন বর্ণের হিন্দু) কেউ কেউ জমি, পর্যাপ্ত আবাসন, শিক্ষা এবং কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে বিধিনিষেধের সম্মুখীন হয়েছিল বা সীমিত প্রবেশাধিকার পেয়েছিল। আনুমানিক ৩০০,০০০ উর্দুভাষী (যারা বিহারী নামে পরিচিত, মূলত উর্দুভাষী মুসলমান যারা বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের আগে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে স্থানান্তরিত হয়েছিল) জনগোষ্ঠীর সদস্যরা জানিয়েছে যে তাদের স্থায়ী ঠিকানা না থাকার কারণে তাদের পাসপোর্টের আবেদন কখনো কখনো ইমিগ্রেশন কর্মকর্তারা প্রত্যাখ্যান করেছেন। এই জনগোষ্ঠীর প্রায় সকলে ১৯৭০ এর দশকে ইন্টারন্যাশনাল কমিটি অফ দ্য রেডক্রস দ্বারা প্রতিষ্ঠিত শরণার্থী-শিবির সদৃশ ক্যাম্পগুলোতে বসবাস করছেন; তারা ভেবেছিল যে ১৯৭১ সালের যুদ্ধের পর তারা পাকিস্তানে ফিরে যাবে। ২০০৮ সালে হাইকোর্টের এক রায়ে উল্লেখ করা হয়েছিল যে, বিহারী সম্প্রদায়ের নাগরিক হিসেবে আন্তর্জাতিক দাতা সম্প্রদায়কে সহায়তা বন্ধ করার জন্য অনুরোধ করার অধিকার রয়েছে কারণ এই জনগোষ্ঠী টেকনিক্যালি (কারিগরিভাবে) আর রাষ্ট্রহীন নয়। যদিও সরকার পানি ও বিদ্যুৎসহ কিছু মৌলিক সেবা দিয়ে থাকে তবে বিহারীরা সামাজিক ও অর্থনৈতিক বৈষম্যের পাশাপাশি সমাজে তাদের একীভূত করার উদ্যোগের অভাবের কথা জানিয়েছে, যা তাদেরকে ক্যাম্পের ঘিঞ্জি পরিবেশে বিচ্ছিন্ন অবস্থায় রেখেছে। আদিবাসী জনগোষ্ঠী সরকারি চাকরি ও উচ্চ শিক্ষার ক্ষেত্রে পার্বত্য চট্টগ্রামের বাসিন্দা আদিবাসীদের জন্য কোটা থাকা সত্বেও পার্বত্য চট্টগ্রাম ও দেশব্যাপী আদিবাসী জনগোষ্ঠী ব্যাপক বৈষম্য ও নির্যাতনের সম্মুখীন হয়েছিল। ১৯৯৭ সালের পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তি চুক্তিতে স্থানীয় শাসনের বিধান থাকার পরও এই অবস্থা চলছে, কারণ শান্তি চুক্তি এখনো সম্পূর্ণরূপে বাস্তবায়িত হয়নি। পার্বত্য চট্টগ্রামের আদিবাসীরা ভূমি কমিশন আইনের অধীনে ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি পদ্ধতির বিষয়ে মতানৈক্যের কারণে তাদের জমিকে প্রভাবিত করে এমন সিদ্ধান্তে কার্যকরভাবে অংশগ্রহণ করতে পারেনি। স্থানীয় সংগঠনগুলো দাবি করেছে যে সেনাবাহিনী ও গোয়েন্দা বাহিনী বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে ও নির্বিচারে গ্রেফতার করেছে; মিথ্যা অভিযোগে আদিবাসীদের মারধর, হয়রানি, হুমকি এবং জেলে পাঠানো হয়েছে; এবং অধিকার কর্মীদের সন্ত্রাসী এবং চাঁদাবাজ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। আদিবাসী আন্দোলন কর্মীরা দাবি করেছেন যে, জনশুমারিতে জাতিগত সংখ্যালঘুদের ব্যাপকভাবে কম গণনা করা হয়েছে, যা ভূমি অধিকার এবং পার্বত্য চট্টগ্রামের উন্নয়ন বাজেট ও অন্যান্য আদিবাসী ভূমিকে প্রভাবিত করছে। সরকারি জনশুমারিতে ১৬ লাখ ৫০ হাজার সংখ্যালঘু জনসংখ্যা উল্লেখ করা হয়েছে। যেখানে আদিবাসী জনগণের সংগঠন বাংলাদেশ ইনডিজিনিয়াস পিপল’স ফোরাম-এর হিসেব মতে জাতিগত সংখ্যালঘুর সংখ্যা প্রায় ৩০ লাখ। দেশে দারিদ্র্যের হার যেখানে ২০ শতাংশ, সেখানে সমতল ভূমিতে বসবাসকারী আদিবাসী জনগোষ্ঠীর মধ্যে কোথাও কোথাও দারিদ্র্যের হার ৮০ শতাংশের বেশি এবং পার্বত্য চট্টগ্রামে এই হার ৬৫ শতাংশেরও বেশি। সংস্থাগুলো নিশ্চিত করেছে যে আদিবাসীদের জন্য যে স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা রয়েছে তার মান দেশের আদিবাসী নয় এমন ব্যক্তিদের জন্য থাকা স্বাস্থ্যসেবার মান থেকে বেশ কম ছিল। মানবাধিকার সংগঠনগুলো ক্রমাগত অভিযোগ করে আসছে যে পার্বত্য চট্টগ্রামে স্থানীয় বাসিন্দাদের বিরুদ্ধে উচ্ছেদ এবং সাম্প্রদায়িক হামলা চলতে থাকে এবং এই ধরনের আক্রমণ প্রায়ই সরকার, সেনাবাহিনী এবং গোয়েন্দা সংস্থার নির্দেশে হয়ে থাকে। ৯ আগস্ট অনুষ্ঠিত বিশ্ব আদিবাসী দিবস পালনকালে বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরাম জাতিগত সংখ্যালঘুদের “আদিবাসী মানুষ” হিসেবে সাংবিধানিক স্বীকৃতি আদায়ের দাবীতে এক আলোচনা সভার আয়োজন করেছিল। জানুয়ারিতে গণমাধ্যমে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয় যে, পাবর্ত্য চট্টগ্রামের বান্দরবান জেলার একটি ম্রো গ্রামে ১০০ জন লোক লাঠিসোটা নিয়ে হামলা চালায়। হামলাকারীরা বারোটা ম্রো বাড়ি ভাংচুর ও পুড়িয়ে দেয় এবং ঘর থেকে মোবাইল ফোন, বাসনপত্র, জামাকাপড়, গবাদি পশু ও হাঁস-মুরগি লুটতরাজ করে। জনগোষ্ঠীর সদস্যরা অভিযোগ করেছেন যে হামলাকারীরা লামা রাবার ইন্ডাস্ট্রিজের সাথে যুক্ত এবং তারা গ্রামবাসীদের এলাকা ছেড়ে দিতে বলছিল। রাবার প্ল্যান্টেশন কোম্পানির দাবী হলো যে, আদিবাসীরা কোম্পানির জমিতে ঘর বাড়ি তৈরি করেছে। পার্বত্য চট্টগ্রাম ব্যতীত অন্যান্য অঞ্চলে আদিবাসী সম্প্রদায়গুলো বাঙালি মুসলমানদের কাছে তাদের জমি হারানোর কথা বলেছেন এবং আদিবাসীদের নিয়ে কাজ করে এমন সংগঠনগুলো রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবির ও অন্যান্য বাণিজ্যিক কারণে বন উজাড় করার কথা জানিয়েছে যা তাদের জমির মারাত্মক পরিবেশগত অবনতি ঘটিয়েছে, তাদের জীবন-জীবিকায় বিরূপ প্রভাব ফেলেছে। জানুয়ারী মাসে পার্বত্য চট্টগ্রামের রাজনৈতিক দল পাবর্ত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি (পিসিজেএসএস) তাদের এক বার্ষিক প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে যে, পার্বত্য চট্টগ্রামে নিরাপত্তা বাহিনী, সশস্ত্র চরমপন্থী গোষ্ঠী এবং ভূমি দখলকারীদের দ্বারা পূর্ববর্তী বছরে ২৩৫টি মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটেছে। পিসিজেএসএস আরো উল্লেখ করেছে যে, সরকার ১৯৯৭ সালের চুক্তি বাস্তবায়নের মাধ্যমে রাজনৈতিক ও শান্তিপূর্ণ উপায় ব্যবহার না করে পার্বত্য চট্টগ্রামের পরিস্থিতির ব্যবস্থাপনায় “সামরিক পদক্ষেপ” নেওয়া বাড়িয়েছে। আদিবাসী নারী ও শিশুদের উপর বাঙালি প্রতিবেশী বা নিরাপত্তা কর্মীদের দ্বারা যৌন নির্যাতনের ঘটনাগুলো অমীমাংসিত রয়ে গেছে। শিশু জন্ম নিবন্ধন: সরকার বাংলাদেশে জন্মগ্রহণকারী রোহিঙ্গা শরণার্থীদের জন্য জন্ম নিবন্ধন করেনি বা নাগরিকত্ব প্রদান করেনি, যদিও ইউএনএইচসিআরকে শরণার্থী শিবিরের মধ্যে জন্ম নিবন্ধনের অনুমতি দিয়েছে। শিক্ষা: আইনে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত শিক্ষা বিনামূল্যে ও বাধ্যতামূলক করা হয়েছে এবং সরকার মেয়েদের দশম শ্রেণি পর্যন্ত ধরে রাখার জন্য অভিভাবকদের ভর্তুকি প্রদান করেছে। প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তির ক্ষেত্রে জেন্ডার সমতা থাকলেও মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষা সমাপনীর হার কমেছে; মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষা সমাপ্তির ক্ষেত্রে ছেলেরা মেয়েদের তুলনায় সংখ্যায় বেশি ছিল। বাল্য বিয়ে ও জোরপূর্বক বিয়ে মাধ্যমিক বিদ্যালয় থেকে মেয়েদের ঝরে পড়ার অন্যতম কারণ ছিল। শিশু নির্যাতন: যৌন নির্যাতন, শারীরিক ও অপমানজনক শাস্তি, শিশুকে পরিত্যক্ত করা, অপহরণ এবং পাচারসহ অনেক ধরনের শিশু নির্যাতন মারাত্মক ও ব্যাপকভাবে চলছে। আইনে শিশু নির্যাতন নিষিদ্ধ করা হয়েছে এবং এই আইনের অবহেলায় পাঁচ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড, জরিমানা বা উভয় দণ্ডের শাস্তির বিধান রয়েছে। সমাজসেবা বিভাগ সহিংসতা, নির্যাতন এবং শোষণের সম্মুখীন হওয়া শিশুদের সাহায্য করার জন্য বিনামূল্যের টেলিফোন সেবা “চাইল্ড হেল্পলাইন – ১০৯৮” পরিচালনা করে। হটলাইনটি বছরে গড়ে প্রায় ৮০,০০০ কল পেয়েছিল এবং দেশের যেকোনো স্থান থেকে এটিতে কল করা যায়। হটলাইন কেন্দ্র থেকে উদ্ধার, রেফার করা এবং কাউন্সেলিং-এর মতো সেবাগুলো দেয়া হয়ে থাকে। এই বছর ইসলামী মাদ্রাসার প্রাক্তন শিক্ষার্থীরা শিক্ষক এবং তাদের চেয়ে বেশি বয়সী শিক্ষার্থীদের দ্বারা যৌন নির্যাতনের একাধিক অভিযোগের বিস্তারিত বিবরণ দিয়েছিল। ফেব্রুয়ারি মাসে ঢাকার একটি আদালত ২০১৯ সালে নয় বছর বয়সী এক শিক্ষার্থীকে ধর্ষণের অভিযোগে একজন মাদ্রাসা শিক্ষককে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেয়। মে মাসে একজন মাদ্রাসা শিক্ষক মাদ্রাসায় বিকেল ৪টার সময় পড়তে গেলে আট বছর বয়সী একটি মেয়েকে তার কক্ষে ডেকে নিয়ে ধর্ষণ করে বলে জানা গেছে। মে মাসে পুলিশ দুই কিশোরকে ধর্ষণের অভিযোগে ছাত্রলীগের স্থানীয় এক নেতাকে গ্রেফতারের পর তাকে দল থেকে বহিস্কার করা হয়েছিল। জুলাই মাসে গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন থেকে জানা যায় পুলিশ বাড়ি থেকে অপহৃত আট বছর বয়সী এক মেয়ের লাশ রাজশাহীর একটি পুকুর থেকে উদ্ধার করেছে। তার শরীরে ধর্ষণের চিহ্ন পাওয়া গেছে। অগ্রগতি সত্ত্বেও শিশু পাচার এবং পাচার থেকে বেঁচে ফিরে আসাদের জন্য অপর্যাপ্ত যত্ন ও সুরক্ষার সমস্যাগুলো অব্যাহতভাবে রয়ে গেছে। শিশু শ্রম এবং কর্মক্ষেত্রে নির্যাতন/অপব্যবহারের সমস্যা কিছু নির্দিষ্ট শিল্পে এখনো রয়ে গেছে এবং এগুলো বেশিরভাগই অনানুষ্ঠানিক খাতে এবং শিশু গৃহকর্মীরা কর্মক্ষেত্রে সব ধরনের নির্যাতনের শিকার হওয়ার ঝুঁকির মধ্যে ছিল। শিশু, বাল্য ও জোরপূর্বক বিবাহ: বিবাহের বৈধ বয়স নারীদের জন্য ১৮ বছর এবং পুরুষদের জন্য ২১ বছর। আইনে “বিশেষ পরিস্থিতিতে” যে কোনো বয়সে নারী ও পুরুষের বিবাহের বিধান রয়েছে। ইউএনএফপিএ-এর ২০২৩ সালের প্রতিবেদন অনুযায়ী ৫১ শতাংশ মেয়ের বিয়ে তাদের বয়স ১৮ হওয়ার আগেই হয়েছে। বাল্যবিবাহের উচ্চ হার ছেলেদের তুলনায় মেয়েদের বেশি হারে স্কুল ত্যাগের কারণ। ইউনিসেফ এর তথ্য মতে, যে মেয়েরা শৈশবে বিয়ে করে তাদের স্কুলে থাকার সম্ভাবনা কমে। সরকারি পরিসংখ্যানে বাল্য বিয়ের সংখ্যা ইউএনএফপিএ-এর চেয়ে কম হওয়া সত্বেও সেটা অনেক বেশি। জুন মাসে বিবিএস জানিয়েছে যে ২০২২ সালে ১৫ থেকে ১৮ বছর বয়সী মেয়েশিশুদের বাল্য বিয়ের সংখ্যা ২০২২ সালের চেয়ে উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। বিবিএসের এর তথ্য মতে ২০২২ সালে ৪০.৯ শতাংশ ১৮ বছরের কম বয়সী মেয়ের বিয়ে হয়েছিল, যা ২০২১ সালে ছিল ৩২.৪ শতাংশ। বাল্য বিয়ের এই হার আবার শহরের তুলনায় পল্লী এলাকায় বেশি ছিল। পরিসংখ্যান থেকে আরো জানা যায় যে, ২০২২ সালে ১৫ বছরের কম বয়সী মেয়েদের বাল্য বিয়ে ২০২১ সালের ৪.৭ শতাংশ থেকে বেড়ে ৬.৫ শতাংশ হয়েছে। বাল্য ও জোরপূর্বক বিয়ে কমানোর লক্ষ্যে সরকার বাধ্যতামূলক শিক্ষা স্তরের পরেও মেয়েদের শিক্ষা ব্যয়ের জন্য উপবৃত্তি দিয়ে থাকে। সরকার এবং এনজিওগুলো কর্মশালা এবং অনুষ্ঠানের আয়োজন করে অভিভাবকদের তাদের মেয়েদের বিয়ের ক্ষেত্রে মেয়েদের বয়স ১৮ বছর না হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করার গুরুত্ব সম্পর্কে জানিয়েছে। মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সূত্র মতে, বাল্যবিবাহ এবং অন্যান্য সেবা পাওয়ার জন্য দুটি মোবাইল সেবা ব্যবস্থা ছিল: একটি হলো জয় অ্যাপ এবং অন্যটি “১০৯ হটলাইন।” বাল্যবিবাহ প্রতিরোধে বিদ্যমান আইন ও অন্যান্য তথ্য প্রদানের লক্ষ্যে মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে একটি ডিজিটাল লাইব্রেরি যুক্ত করা হয়েছে। শিশুদের যৌন শোষণ: আইনে শিশুদের যৌন শোষণ নিষিদ্ধ; শিশুদের যৌন শোষণের অপরাধে দোষী সাব্যস্ত হলে শাস্তি ১০ বছর থেকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড। শিশু পর্নোগ্রাফি এবং এই ধরনের সামগ্রী বিক্রি বা বিতরণ নিষিদ্ধ ছিল। যৌন পাচারের শিকার শিশুদের পতিতালয়ে পাচারকারীরা ১৮ বছরের বেশি বয়সী বলে নোটারী প্রত্যয়নপত্র তৈরি করতে পেরেছিল এবং পর্যবেক্ষকদের কারো কারো দাবি যে সরকারের দুর্নীতিগ্রস্ত কর্মকর্তা এবং দুর্নীতিগ্রস্ত আইন প্রয়োগকারী কর্মকর্তারা এই ধরনের চর্চাকে প্রশ্রয় দিয়েছে বা সহজতর করেছে। আন্তঃসীমান্ত পাচারের পাশাপাশি পাচারকারীরা সারা দেশের মেয়েদেরকে প্রলুব্ধ করে বৈধ ও অবৈধ পতিতালয় এবং হোটেলে বাণিজ্যিক যৌন শোষণের জন্য ব্যবহার করেছিল। ইহুদীবিরোধীতা দেশে কোনো ইহুদি জনগোষ্ঠীর কেউ ছিল না। রাজনীতিবিদ এবং ইমামরা তাদের নির্বাচনী এলাকা থেকে সমর্থন পাওয়ার জন্য ইহুদি বিরোধী বক্তব্য দিয়েছেন। মানব পাচার স্টেট ডিপার্টমেন্টের ট্রাফিকিং ইন পারসন্স রিপোর্ট এখানে দেখুন: https://www.state.gov/trafficking-in-persons-report/ . বলপূর্বক অঙ্গ সংগ্রহ করা দেশে অঙ্গ সংগ্রহ অব্যাহত রয়েছে। জুলাই মাসে র্যাব কিডনি পাচারের একটি সংঘবদ্ধ চক্রের সন্দেহভাজনদের গ্রেফতারের কথা প্রকাশ করে। পাচারকারী চক্রের অভিযুক্ত নেতা দাবি করেছে যে সে নিজে ২০১৯ সালে কিডনি বিক্রি করাকালে ভারতের একজন দালালের দ্বারা প্রতারিত হয়ে কম অর্থ পেয়েছিল। র্যাবের সূত্র মতে, চক্রের ওই নেতা র্যাবকে ভারতে কিডনি প্রতিস্থাপন রোগীদের বিপুল চাহিদার কথা জানতে পেরে অঙ্গ পাচার চক্র গড়ে তোলার কথা জানিয়েছে। অনলাইনে বা বিভিন্ন এলাকা থেকে স্থানীয় দালালদের মাধ্যমে কিডনির প্রয়োজন ছিল এমন ধনী খদ্দের খুঁজে পাওয়ার পর অভিযুক্তরা কিডনি দাতাদের ভারতে পাঠানোর ব্যবস্থা করে। গ্রেফতারকালে র্যাব কিডনি দাতা ও গ্রহীতার জাল সার্টিফিকেট, পাসপোর্ট, ব্যাংক কার্ড, ভারতীয় রুপি এবং বাংলাদেশি টাকা উদ্ধার করে। অঙ্গ পাচারকারীরা কিডনি গ্রহীতাদের কাছ থেকে কিডনি প্রতি পঞ্চাশ লাখ টাকা পর্যন্ত নিয়েছে কিন্তু দাতাদের ৫০০,০০০ থেকে ৬০০,০০০ টাকা দিয়েছে। র্যাবের অনুমান, গ্রেফতারের আগে অঙ্গ পাচারকারী চক্র ৫০টি কিডনি বিক্রি করেছে। যৌন পরিচিতি, জেন্ডার পরিচয় বা অভিব্যক্তি অথবা যৌন বৈশিষ্ট্যের উপর ভিত্তি করে সহিংসতা, অপরাধ হিসেবে দেখা এবং অন্যান্য নির্যাতন অপরাধ হিসেবে দেখা: দণ্ডবিধির অধীনে সমলিঙ্গের যৌন আচরণ অবৈধ, যার কারণে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড পর্যন্ত শাস্তি হতে পারে। সরকার এই আইন সক্রিয়ভাবে প্রয়োগ করেনি। এলজিবিটিকিউআই+ জনগোষ্ঠীর সদস্যরা জানিয়েছে যে, সরকার সামাজিক চাপের কারণে আইনটি রেখে দিয়েছে। এলজিবিটিকিউআই+ ব্যক্তিদের উদ্দেশ্য করে যে বৈষম্যমূলক আইন সেটি প্রত্যাহার বা বাতিল করার কোন বিশ্বাসযোগ্য চেষ্টা দেখা যায়নি। সহিংসতা ও হয়রানি: এলজিবিটিকিউআই+ জনগোষ্ঠীর সদস্যরা টেলিফোন, টেক্সট এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে হুমকিমূলক বার্তা পেয়েছে এবং কেউ কেউ পুলিশ দ্বারা হয়রানির শিকার হয়েছে। তারা শারীরিক সহিংসতার ক্রমাগত হুমকির কারণে অনলাইন এবং শারীরিক নিরাপত্তার প্রয়োজনীয়তার উপর জোর দিয়েছে। সরকার এলজিবিটিকিউআই+ ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে সহিংসতা ও অপব্যবহারে জড়িতদের তদন্ত, বিচার এবং শাস্তি দিতে কিছু পদক্ষেপ নিয়েছিল। এলজিবিটিকিউআই+ অ্যাডভোকেসি সংস্থাগুলো জানিয়েছে যে, পুলিশ আইনকে এলজিবিটিকিউআই+ ব্যক্তি এবং যৌন পরিচিতি নির্বিশেষে এলজিবিটিকিউআই+ বলে প্রতীয়মান হয় এমন ব্যক্তিদের হয়রানি করার অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করেছে। কিছু গ্রুপ পুলিশ কোডের সন্দেহজনক আচরণের বিধানের অধীনে হয়রানির কথাও জানিয়েছে। এলজিবিটিকিউআই+ ব্যক্তিরা গত এক দশকে সহিংস চরমপন্থী হামলার পরিপ্রেক্ষিতে উচ্চ মাত্রার ভয়, হয়রানি এবং আইন প্রয়োগকারীদের পদক্ষেপ গ্রহণের অভিজ্ঞতা অর্জন করেছে। আগস্ট মাসের ২০ তারিখে গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন থেকে জানা যায় যে ইসলামিক চরমপন্থীরা সাভারের একজন সমকামী স্কুল শিক্ষক গোলাম কিবরিয়াকে হত্যা করেছে এই দাবীতে যে, কিবরিয়ার যৌন পরিচিতি তাদের বিশ্বাসের সাথে সাংঘর্ষিক। মানবাধিকার গোষ্ঠীগুলোর মতে এটি কোন বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয় বরং এটি দেশের মধ্যে এলজিবিটিকিউআই+ ব্যক্তিদের বৃহত্তর পরিসরে মানবাধিকার লঙ্ঘনের প্রতীক। এনজিওগুলো শরণার্থী শিবিরে বসবাসকারী রোহিঙ্গা এলজিবিটিকিউআই+ ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে উচ্চ মাত্রার যৌন ও জেন্ডারভিত্তিক সহিংসতার কথা জানিয়েছে, যারা বলেছে যে তাদের শারীরিক ও মানসিক চাহিদা পর্যাপ্তভাবে পূরণ হচ্ছে না। বৈষম্য: আইনে যৌন পরিচিতি, সামাজিক জেন্ডার পরিচয় বা অভিব্যক্তি, বা যৌন বৈশিষ্ট্যের উপর ভিত্তি করে রাষ্ট্রীয় এবং অ-রাষ্ট্রীয় সংস্থার দ্বারা বৈষম্য নিষিদ্ধ করা হয়নি। এলজিবিটিকিউআিই+ গ্রুপগুলো নিয়োগ ও পেশা, আবাসন এবং স্বাস্থ্যসেবা ও ন্যায়বিচার পাওয়াসহ সরকারি সেবাগুলো পাওয়ার ক্ষেত্রে বৈষম্যের কথা জানিয়েছে। যদিও সরকার তৃতীয়- লিঙ্গের ব্যক্তিদের কর্মসংস্থান লাভে সহায়তা করার জন্য সীমিত আকারে প্রশিক্ষণ এবং কর্মসংস্থানের সুযোগ করে দিয়েছে, তবে অধিকার কর্মীরা বলেছেন যে শুধুমাত্র অল্প সংখ্যক তৃতীয়- লিঙ্গের ব্যক্তি উত্পাদন এবং সেবা খাতে কাজ করছে এবং অনেকেই কর্মক্ষেত্রে বৈষম্যের সম্মুখীন হয়। মানসিক স্বাস্থ্যসেবা উদ্বেগের শীর্ষে ছিল এবং এই গোষ্ঠীগুলোর মতে মানসিক স্বাস্থ্যসেবাদানকারীদের মধ্যে এলজিবিটিকিউআই+ ব্যক্তিদের লজ্জা দেওয়ার জন্য নৈতিকতামূলক শব্দ ব্যবহার করার প্রবণতা দেখা গেছে । প্রি-এক্সপোজার এবং পোস্ট-এক্সপোজার ওষুধ পেয়েছে যৌনকাজে যার ব্যবহার এইচআইভি সংক্রমণ প্রতিরোধ করে। এইচআইভি পরীক্ষা বিনামূল্যে করা গেছে , তবে এইচআইভি পরীক্ষা করা এবং চিকিৎসার বিষয়ে কলঙ্ক বা অপবাদের বিষয়টি এখনো জোরালোভাবে বহাল রয়েছে। দেশের কিছু হিজড়া রূপান্তরকামী নারী যারা নিজেদেরকে হিজড়া (একটি দক্ষিণ এশীয় সাংস্কৃতিক পরিভাষা যা কিছু হিজড়া রূপান্তরকামী নারী ও তাদের পাশাপাশি কিছু উভলিঙ্গ আন্তলিঙ্গ এবং সামাজিক লিঙ্গ পরিচয় নিশ্চিন্ত না করা স্বতন্ত্র ব্যক্তি) হিসেবে পরিচিত করতে চান, সেটা হিজড়া উপসাংস্কৃতিক কারণে কিংবা বর্ধিত সামাজিক সুরক্ষা পাওয়ার আকাঙ্খায়, তবে সবাই এটি বেছে নেয়নি। তাই অনেক ট্রান্সজেন্ডার নারী ট্রান্সজেন্ডার হিসেবে তাদের পরিচয় নিশ্চিত করেছেন এবং যারা তাদেরকে হিজড়া হিসেবে চিহ্নিত করে তাদেরকে সংশোধন করে দেন। এদিকে ট্রান্সজেন্ডার (হিজড়া রূপান্তরকামী) পুরুষরা সামান্য সমর্থন বা সহনশীলতা পেয়ে থাকেন বিশেষ করে দরিদ্র ও পল্লী এলাকাগুলোতে। ট্রান্সজেন্ডার অধিকার নিয়ে কর্মরতরা দাবি করেছেন যে সরকার কিছু ক্ষেত্রে হিজড়াদের বিভিন্ন ধরনের সেবা সুবিধা দেওয়ার আগে তাদের যৌনাঙ্গ পরীক্ষা করেছিল। আইনিভাবে সামাজিক লিঙ্গ স্বীকৃতির সহজলভ্যতা: ভোটার নিবন্ধন ফর্মসহ পাসপোর্ট এবং আইনিভাবে শনাক্তকরণ নথিগুলোতে তৃতীয় লিঙ্গ হিসেবে “X” চিহ্ন বা “হিজড়া” নির্বাচন করার বিকল্প রয়েছে। এই বছরে পরিচালিত জাতীয় জনশুমারিতে “তৃতীয় লিঙ্গ” বিভাগ বা ক্যাটাগরি অন্তর্ভুক্ত ছিল। যদিও সরকার হিজড়া ব্যক্তিদের সামাজিক স্বীকৃতির প্রচারে কিছুটা অগ্রগতি করেছে, তবে সরকার এলজিবিটিকিউআই+ সম্প্রদায়ের অন্তর্ভুক্ত অন্যদের অধিকার প্রচারের জন্য সীমিত চেষ্টা করেছিল এবং আইনি স্বীকৃতি দেয়নি। অনৈচ্ছিক বা জবরদস্তিমূলক চিকিৎসা বা মনস্তাত্ত্বিক অনুশীলন: এলজিবিটিকিউআই+ আন্দোলনকর্মীরা জানিয়েছেন যে, তথাকথিত রূপান্তর থেরাপি অনুশীলনগুলোর ব্যবহার ব্যাপক ছিল। সমকামী নারী এবং সমকামী পুরুষরা তাদের অভিজ্ঞতার কথা বলতে গিয়ে জানিয়েছে যে, তাদের মা বাবা তাদেরকে মাদক পুনর্বাসন কেন্দ্রগুলোতে পাঠিয়েছে এবং সেখানে তাদেরকে জোর করে ঘুমের ওষুধ খেতে হয়েছে, ঐতিহ্যবাহী পোশাক পরতে বাধ্য করা হয়েছে এবং কোরআন তেলাওয়াত করতে হয়েছে। সরকার এই ধরনের চর্চাগুলোর নিন্দা করেনি। মত প্রকাশের স্বাধীনতা, সংগঠিত হওয়া বা শান্তিপূর্ণ সমাবেশের উপর বিধিনিষেধ: দেশে এলজিবিটিকিউআই+ বিষয়গুলো নিয়ে কাজ করা সংস্থাগুলো আনুষ্ঠানিকভাবে এলজিবিটিকিউআই+ এনজিও হিসেবে সরকারিভাবে নিবন্ধিত না হওয়ার কারণে প্রকল্পগুলোতে অর্থায়ন পেতে এবং বাস্তবায়নে বড় বাধার সম্মুখীন হয়েছিল। নারী সমকামীদের নিয়ে কাজ করে এমন সংস্থা বিরল ছিল, যদিও এলজিবিটিকিউআই+ সংস্থাগুলোর কার্যক্রম প্রথাগত পুরুষ এবং হিজড়া অংশগ্রহণকারীদের ছাড়িয়ে আগের চেয়ে আরো বেশি প্রসারিত হয়েছে। যৌন পরিচিতি নিয়ে গুরুতর সামাজিক অপবাদ সাধারণ ঘটনা ছিল এবং যা এই বিষয়টি নিয়ে খোলামেলা আলোচনাকে বাধা দিয়েছিল। প্রতিবন্ধী ব্যক্তি আইনে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য সমান আচরণ এবং বৈষম্য না করার কথা বলা হয়েছে এবং সরকার বেশিরভাগ ক্ষেত্রে এই বিধানগুলো প্রয়োগ করার জন্য কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে। আইন অনুযায়ী অবকাঠামো প্রতিবন্ধীদের জন্য প্রবেশগম্য হতে হবে। কিন্তু সরকার এই আইনটি কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করেনি এবং সরকারি ভবনে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য কোনো কার্যকর ব্যবস্থা ছিল না। আইনে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তি হওয়া এবং চাকরিতে প্রবেশের জন্য পরিচয়পত্র নিবন্ধন করার বিধান রাখা হয়েছে। এই নিবন্ধন তাদেরকে ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হওয়া, ভোট দেয়া এবং নির্বাচনে অংশগ্রহণের অনুমতি দেয়। স্থানীয় এনজিওগুলোর অনুমান প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের মধ্যে ৫০ থেকে ৬০ শতাংশ ব্যক্তি তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারেনি, কারণ ভোট কেন্দ্রে প্রতিবন্ধীবান্ধব ছিল না। এনজিওদের দেয়া তথ্য মতে, কিছু প্রতিবন্ধী শিশু তাদের চলাচল উপযোগী ব্যবস্থা না থাকায় বা প্রতিবন্ধীবান্ধব না হওয়ায় সরকারি স্কুলে যায়নি। সরকার অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষার উপর শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ দিয়েছে এবং জেলা পর্যায়ে প্রতিবন্ধী বিশেষজ্ঞ নিয়োগ করেছে। এছাড়াও সরকার প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের জন্য উপবৃত্তিও বরাদ্দ করেছে। অনেক সংস্থা জানিয়েছে যে, দৃষ্টি প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের প্রযুক্তি ব্যবহারের ক্ষেত্রে প্রবেশগম্যতা ছিল না। যদিও দৃষ্টি প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরা নিজেরা জানিয়েছে যে সরকারি ওয়েবসাইটগুলো দৃষ্টি প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য ব্যবহারবান্ধব ছিল। তবে তারা এটাও বলেছে যে, প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য দরকারি তথ্য ওয়েব পোর্টালগুলোতে সাধারণত স্ক্যান করা নথি হিসেবে আপলোড করায় দৃষ্টি প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরা পড়ার জন্য যে সফ্টওয়্যার ব্যবহার করেন সেগুলো স্ক্যান করা কপি পড়ার উপযোগী না হওয়ায় তারা তাদের জন্য আপলোড করা তথ্যগুলো পড়তে পারেননি। সরকার প্রতি বছর দৃষ্টি প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের পড়ার উপযোগী বই সরবরাহ করে থাকে। প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে সহিংসতা ও নির্যাতনের জন্য দায়ী ব্যক্তিদের খুঁজে পেতে সরকার তদন্ত করার ব্যবস্থা নিয়েছে। মানসিক প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের চিকিৎসার জন্য সরকারি সুযোগ-সুবিধা অপর্যাপ্ত ছিল।
অধ্যায় ৭
শ্রমিকের অধিকার ক. সংগঠনের স্বাধীনতা এবং যৌথ দর কষাকষির অধিকার আইনে ইউনিয়নে যোগদান করা এবং সরকারি অনুমোদন সাপেক্ষে ইউনিয়ন গঠনের অধিকার দেয়া হয়েছে। তবে এই আইনটি অনানুষ্ঠানিক খাতের শ্রমিকদের জন্য প্রযোজ্য নয়, যাদের সংখ্যা দেশের মোট শ্রমশক্তির প্রায় ৮৫ শতাংশ। শ্রমিকের আইনী সংজ্ঞায় ব্যবস্থাপকীয়, তত্ত্বাবধায়ক এবং প্রশাসনিক কর্মীদের বাদ রাখা হয়েছে। সরকারি কর্মচারী, অগ্নি নির্বাপক দলের কোন সদস্য, নিরাপত্তা কর্মী এবং নিয়োগকর্তাদের গোপনীয় সহকারীগণ ইউনিয়নের অন্তর্ভুক্ত হতে পারবেন না। রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চল (ইপিজেড) এবং বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলোতে ইউনিয়ন গঠন করা অনুমোদিত নয়৷ আইনে ইউনিয়নভুক্ত শ্রমিকদের যৌথ দর কষাকষি ও আইন মেনে ধর্মঘট করার অধিকার দিয়েছে এবং ইউনিয়ন বিরোধী বৈষম্যকে নিষিদ্ধ করেছে। আইনে যৌথ দর কষাকষি ইউনিয়নভুক্ত শ্রমিকদের সমঝোতায় পৌঁছাতে ব্যর্থ হলে ধর্মঘটের অধিকার দিলেও, এই অধিকার প্রয়োগের ক্ষেত্র শর্ত দ্বারা সীমিত করেছে। কোন বিষয় নিয়ে ধর্মঘটের ক্ষেত্রে কমপক্ষে ৭৫ শতাংশ ইউনিয়ন শ্রমিকের সমর্থন থাকতে হবে। সরকার কোন ধর্মঘট নিষিদ্ধ করতে পারবে যদি সরকারের কাছে প্রতীয়মান হয় কোন ধর্মঘট “(শ্রমিক) মানুষের জন্য গুরুতর অসুবিধার কারণ হবে” এবং ৩০ দিনের বেশি স্থায়ী যে কোনো ধর্মঘট সরকার বন্ধ করতে পারবে। এছাড়াও আইনে বিদেশী বিনিয়োগে পরিচালিত বা বিদেশী বিনিয়োগকারীর মালিকানাধীন কারখানার ক্ষেত্রে বাণিজ্যিক উৎপাদনের প্রথম তিন বছরের মধ্যে ধর্মঘট নিষিদ্ধ করা হয়েছে। কিছু কিছু ধর্মঘটের ক্ষেত্রে জটিল আইনী চাহিদা মানার দরকার হলেও ধর্মঘট বা কর্মবিরতি প্রায়শ স্বতঃস্ফূর্তভাবে ঘটেছে। এই বছর কয়েকটি খাতের কর্মীরা বকেয়া বেতন, অনুপযুক্ত বা বেআইনিভাবে প্রতিষ্ঠান বন্ধ রাখা, লে-অফ, ছাঁটাই, চাকুরির অবসান এবং কর্মস্থলে বৈষম্যের কারণে কর্মবিরতি, ধর্মঘট ও কর্মক্ষেত্রে বিভিন্ন ধরনের পদক্ষেপ নিয়েছিল। আইন অনুযায়ী ৫০ জনের বেশি শ্রমিক আছে এমন প্রতিটি কারখানা একটি অংশগ্রহণকারী কমিটি গঠন করবে। আইনে আরো বলা হয়েছে যে, কোন প্রতিষ্ঠানে/কারখানায় যদি ট্রেড ইউনিয়ন থাকে তাহলে সেখানে অংশগ্রহণকারী কমিটি গঠনের কোনো প্রয়োজন নেই। নিয়োগকর্তারা প্রায়শ আইনের চাহিদা অনুযায়ী শ্রমিকদের বিভিন্ন পদে নির্বাচন করার অনুমতি না দিয়ে তারাই অংশগ্রহণকারী কমিটিতে শ্রমিকদের নির্বাচিত করেন কিংবা নিয়োগ করেছেন। এছাড়াও নিয়োগকর্তারা অংশগ্রহণকারী কমিটির কার্যকারিতা এবং স্বাধীনতার ক্ষেত্রে আইন ও প্রবিধান মেনে চলতে ব্যর্থ হয়েছেন। আইনে ইপিজেডে কর্মরত প্রায় ৪৮৮,০০০ শ্রমিকদের সংগঠিত হওয়া ও যৌথ দর কষাকষির অধিকারকে কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হয়েছে। ইপিজেডে কর্মরত শ্রমিকরা শ্রমিক কল্যাণ সমিতি (ডব্লিউডব্লিউএ) প্রতিষ্ঠা করতে পারে কিন্তু আইনে শ্রমিক কল্যাণ সমিতিকে স্বাধীনভাবে শ্রমিকদের পক্ষে যৌথ দর কষাকষির অনুমোদন দেয়া হয়নি। এছাড়াও আইনে শ্রমিক কল্যাণ সমিতিকে রাজনৈতিক দল, ইপিজেডের বাইরে থাকা ইউনিয়ন, ফেডারেশন বা এনজিওর সাথে যেকোন ধরনের সংযোগ গড়ে তোলা নিষিদ্ধ করা হয়েছে। শ্রমিক কল্যাণ সমিতি (ডব্লিউডব্লিউএ)-গুলো বাংলাদেশ রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চল কর্তৃপক্ষ (বেপজা)-এর কর্তৃত্বাধীন ছিল এবং স্বাধীন ইউনিয়নের ভূমিকায় যাওয়ার চেষ্টা অব্যাহত রেখেছে। আটটি ইপিজেডে চালু ৪৫৬টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে মাত্র ২৮৮টি প্রতিষ্ঠানে ডব্লিউডাব্লিউএ গঠিত হয়েছে। আইনে বেপজাকে ইপিজেডের মধ্যে জনস্বার্থের জন্য ক্ষতিকর বলে প্রতীয়মান হয় এমন যেকোনো ধর্মঘট নিষিদ্ধ করার ক্ষমতা দেয়া হয়েছে। শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের অধীনস্থ কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তর (ডাইফ) বেপজার নির্বাহী চেয়ারম্যানের কাছ থেকে পূর্বানুমতি নেওয়ার প্রয়োজনীয়তাসহ ইপিজেডগুলোতে পরিদর্শন কার্যক্রম পরিচালনায় অব্যাহতভাবে বাধার সম্মুখীন হয়েছে। ২০২২ সালের অক্টোবরে ইপিজেড শ্রম বিধি জারি করার পর ডাইফ ইপিজেডে প্রায় ৪৫টি কারখানা পরিদর্শন করেছে। আইনে ইপিজেড শ্রম আদালত, আপিল ট্রাইব্যুনাল এবং সালিশের বিধান থাকলেও সেসব প্রতিষ্ঠান এখনো ইপিজেডে প্রতিষ্ঠা করা হয়নি। তার পরিবর্তে ১৩টি শ্রম আদালত এবং একটি শ্রম আপিল আদালতে ইপিজেড-এর মামলার শুনানি করা হয়েছে। আইনে ডাইফকে ইপিজেড কারখানাগুলোতে আইন লঙ্ঘনের কারণে শ্রম আদালতে মামলা দায়ের করার কিংবা নোটিশ দেওয়ার ক্ষমতা দেয়া হয়নি; তবে আইনে ডাইফের পর্যবেক্ষণসমূহ সরাসরি বেপজাকে জানানোর বাধ্যবাধকতা রয়েছে। ফেডারেশন গঠনের ক্ষেত্রে ইপিজেড-এর একটি জোনের ৫০ শতাংশেরও বেশি ডব্লিউডব্লিউএ-কে ফেডারেশন গঠন অনুমোদন করতে হবে। বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষের অধীনে ১০টি অর্থনৈতিক অঞ্চল চালু ছিল। তবে অর্থনৈতিক অঞ্চলের প্রতিষ্ঠানগুলোতে পরিদর্শনের কোন কর্তৃত্ব ডাইফের ছিল না। অর্থনৈতিক অঞ্চলের শ্রমিকদের ট্রেড ইউনিয়ন গঠন করতে দেয়া হয়নি এবং তাদেরকে বহিরাগত শ্রমিক অধিকার সংস্থাগুলোর সাথে যোগাযোগ স্থাপনের অনুমতি দেয়া হয়নি। সরকার সমিতি গঠনের স্বাধীনতা, যৌথ দর কষাকষির অধিকার এবং ধর্মঘটের অধিকার রক্ষায় আইনকে কার্যকরভাবে প্রয়োগ করেনি। অন্যায্য শ্রম অনুশীলন এবং ইউনিয়নবিরোধী বৈষম্যের জন্য যে শাস্তি বা অর্থদণ্ড রয়েছে তা নাগরিক অধিকার অস্বীকারের ক্ষেত্রে অন্যান্য আইনে যে শাস্তির বিধান রয়েছে তার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল না। কখনো কখনো লঙ্ঘনকারীদের বিরুদ্ধে শাস্তি প্রয়োগ করা হলেও প্রায়শ নিয়োগকর্তার চেয়ে কর্মীদের বিরুদ্ধে শাস্তি বেশি প্রয়োগ করা হয়েছে। শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের অধীনস্থ শ্রম অধিদপ্তরের প্রতিবেদন অনুসারে ২০২২ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৩ সালের আগস্ট মাস পর্যন্ত সময়কালে শ্রমিকরা অন্যায্য শ্রম অনুশীলন এবং ইউনিয়নের প্রতি বৈষম্যের ১৭টি অভিযোগ দায়ের করেছে। এবং নভেম্বর পর্যন্ত সবগুলো অভিযোগ তদন্তাধীন ছিল। আইনে অন্যায্য শ্রম অনুশীলন বা ইউনিয়ন বিরোধী বৈষম্য নিয়ে শ্রমিকদের সরাসরি শ্রম আদালতে মামলা দায়ের করার অনুমতি দেয়া হয়নি। শ্রমিকদের প্রথমে শ্রম অধিদপ্তরে অন্যায্য শ্রম অনুশীলনের অভিযোগ দায়ের করতে হয়। এরপর শ্রম অধিদপ্তর বিষয়টি তদন্ত করে দেখে এবং সালিশের মাধ্যমে বিবদমান দলগুলোকে ঐকমত্যে আনার চেষ্টা করে। তাদের সিদ্ধান্ত বাধ্যতামূলক নয়। যদি সালিশের মাধ্যমে পক্ষগুলোর মধ্যে সমঝোতা তৈরির চেষ্টা ব্যর্থ হয় তাহলে শ্রম অধিদপ্তর বিষয়টি নিয়ে শ্রম আদালতে মামলা দায়ের করতে পারে। শ্রম আদালত ইউনিয়ন কার্যক্রমের জন্য বরখাস্ত করা শ্রমিকদের কাজে পুনর্বহালের আদেশ দিতে পারে, কিন্তু এই ধরনের পুনর্বহালের ঘটনা খুব কমই ঘটে। ডাইফের মজুরি-সম্পর্কিত বিরোধের মধ্যস্থতা করার ক্ষমতা রয়েছে। শ্রম সংগঠনগুলোর মতে সমঝোতা প্রক্রিয়া শ্রমিকদের ন্যায়বিচার পাওয়া ধীর বা শ্লথ করে দিয়েছে। আইনে একটি কারখানায় একাধিক ইউনিয়নের অনুমতি দিলেও শ্রম অধিদপ্তর পোশাক শিল্পের প্রতি কারখানায় একের অধিক ইউনিয়নের অনুমতি দেয় না। শ্রমিক নেতারা এ নিয়ে অব্যাহতভাবে বলে আসছেন যে, কারখানায় শুধু ব্যবস্থাপনা-সমর্থিত ইউনিয়ন দ্রুত নিবন্ধন পেয়ে থাকে। ইউনিয়ন গঠনে বাধা আইন ও অনুশীলনে রয়ে গেছে। ইউনিয়নের নিবন্ধন পেতে আইন অনুযায়ী একটি প্রতিষ্ঠানের ন্যূনতম ২০ শতাংশ শ্রমিকের অংশগ্রহণের বাধ্যবাধকতা রয়েছে। শ্রমিক নেতা ও শ্রমিক সংগঠনগুলোর মতে, বৃহদাকার প্রতিষ্ঠানগুলোর ইউনিয়নগুলো ২০ শতাংশ শ্রমিকের এই বাধ্যবাধকতা পূরণের ক্ষেত্রে বড় ধরনের বাধার সম্মুখীন হয়। জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত সময়কালে শ্রম অধিদপ্তর সদস্য সংখ্যার এই সীমা পূরণ করতে ব্যর্থ হওয়ায় ৩৭টি নিবন্ধন আবেদন প্রত্যাখান করেছে। শ্রমিকদের সংগঠনগুলো আইনের বাধ্যবাধকতা ছাড়াও বাস্তবে ঘটে এমন আরো অনেক বাধার কথাও উল্লেখ করেছে; যার মধ্যে রয়েছে নিবন্ধনের জন্য আবেদন করার ৫৫ দিন সময়সীমার মধ্যে আবেদনপত্রগুলো যাচাই বাছাই করে নিবন্ধন প্রত্যয়নপত্র দেওয়ার যে বাধ্যবাধকতা রয়েছে শ্রম অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে সেটা পূরণ করতে না পারা, এই সময়ের মধ্যে শ্রমিকদের স্বাক্ষর যাচাই না করতে পারা এবং ইউনিয়নের পক্ষ থেকে নিবন্ধনের জন্য প্রয়োজনীয় দু’টি সাধারণ সভা আয়োজন না করতে পারা। শ্রম অধিকার সংগঠনগুলো জানিয়েছে যে রাজনীতির সাথে সংশ্লিষ্ট কারখানার মালিকরা ইউনিয়ন নিবন্ধন প্রক্রিয়া এবং ট্রেড ইউনিয়ন কার্যক্রমে হস্তক্ষেপ করেছে। ইন্টারন্যাশনাল ট্রেড ইউনিয়ন কনফেডারেশনের মতে, বাংলাদেশের শ্রম আইন আন্তর্জাতিক শ্রম মানের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় এবং ট্রেড ইউনিয়ন গঠনে বাধা এবং শান্তিপূর্ণ শ্রমিক বিক্ষোভে পুলিশের হস্তক্ষেপ নিয়ে তারা উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। কনফেডারেশন ইউনিয়ন নির্বাচনে হস্তক্ষেপ রোধে আরও শক্তিশালী পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে। শ্রমিক নেতা, সংগঠক ও শ্রমিকরা তাদের সমিতি গঠন ও যৌথ দর কষাকষির অধিকার চর্চা করতে গিয়ে সহিংসতা, হুমকি ও অন্যায্য শ্রম চর্চার শিকার হয়েছে। ২৫ জুন ঢাকার অদূরে অবস্থিত প্রিন্স জ্যাকার্ড সোয়েটার কারখানায় শ্রমিকদের দুই মাসের বকেয়া বেতন ও বোনাস নিয়ে শ্রম বিরোধ মীমাংসার চেষ্টা করার পর বিশিষ্ট শ্রমিক সংগঠক শহীদুল ইসলাম সন্ত্রাসীদের/আততায়ীর হামলায় নিহত হন। শহীদুল ইসলাম বাংলাদেশ গার্মেন্টস অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিয়াল ওয়ার্কার্স ফেডারেশনের গাজীপুর শাখার সভাপতি ছিলেন। সংবাদপত্রে প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী ৯ অগাস্টের ময়নাতদন্তের রিপোর্টে মাথায় আঘাত লেগে প্রচুর রক্তক্ষরণের কারণে তার মৃত্যু হয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। এই মামলা তদন্তে নিয়োজিত প্রধান সংস্থা বাংলাদেশ শিল্পাঞ্চল পুলিশ এই ঘটনায় নয়জন ব্যক্তিকে গ্রেফতার করেছে এবং মূল সন্দেহভাজনদের কাছ থেকে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি আদায় করেছে৷ ফ্যাশন ফোরাম লিমিটেড কারখানায় শ্রমিকদের সংগঠিত করার চেষ্টার পরে, মার্চ মাসে কারখানার ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ প্রস্তাবিত ইউনিয়নের তিনজন সংগঠককে মারধর করে এবং তাদেরকে পদত্যাগ করতে বাধ্য করে। এই ঘটনার প্রতিবাদে পরের দিন শ্রমিকরা বিক্ষোভ করে ও ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের সঙ্গে বিরোধে জড়ায়। ৩১ মার্চ কারখানার ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ কারখানার ভেতরে ইউনিয়ন কার্যক্রমে সহায়তা ও শ্রমিকদের সহিংসতায় জড়িত হতে উত্সাহিত করার অভিযোগে বাংলাদেশ গার্মেন্টস অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিয়াল ওয়ার্কার্স ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক বাবুল আক্তারের বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা দায়ের করে। আক্তারের বিরুদ্ধে আনা এই ফৌজদারি অভিযোগ নভেম্বর পর্যন্ত বিচারাধীন ছিল। শ্রমিক সংগঠনগুলো মন্ডল ফ্যাশনে সম্মিলিত শ্রমিক ইউনিয়নের দ্বিতীয় দফায় ইউনিয়ন নিবন্ধনের চেষ্টার পর শ্রমিক সংগঠক, ইউনিয়ন নেতা ও শ্রমিকদের বিরুদ্ধে সহিংসতা, ভয়ভীতি দেখানো এবং অন্যায্য শ্রম অনুশীলনের অভিযোগ করেছে। প্রকাশিত তথ্য মতে, ১৫ জুলাই মন্ডল ফ্যাশন কারখানা কর্তৃপক্ষ ইউনিয়ন নেতা ও সদস্যদের আটক, মারধর ও হুমকি দিয়েছে। ২৯ জুলাই কারখানার ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ তিন ইউনিয়ন নেতাকে চাকরি অবসানের আদেশে স্বাক্ষর করতে বাধ্য করে। শ্রমিক সংগঠনগুলো জানিয়েছে যে অন্তত ছয়জন ইউনিয়ন নেতা ও সদস্য সম্মিলিত গার্মেন্ট শ্রমিক ফেডারেশন অফিসে আশ্রয় নিয়েছিল এবং অন্যরা তাদের জীবনের ভয়ে এলাকা ছেড়ে চলে গিয়েছিল। শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা যায় যে এই বছর তৈরি পোশাক শিল্প খাতে ১,২০৩টি সক্রিয় ট্রেড ইউনিয়ন এবং প্রায় ৪৫০টি সক্রিয় অংশগ্রহণকারী কমিটি ছিল। তবে শ্রমিক নেতারা অনেক কম সংখ্যক ট্রেড ইউনিয়ন থাকার দাবি করে বলেছেন যে ভীতি, দুর্নীতি ও সহিংসতার কারণে ইউনিয়নগুলো সংগঠিত হয় না। মন্ত্রণালয় জানিয়েছে যে, মৎস্য খাতে ৭১টি সক্রিয় ইউনিয়ন রয়েছে। চামড়া শিল্প খাতে একটি একক ইউনিয়নের অধীনে মাত্র ৭০টি ট্যানারি যুক্ত রয়েছে। চা শিল্প খাতে একটিমাত্র ইউনিয়ন ছিল, যা দেশের সর্ববৃহত্ ইউনিয়ন এবং এই ইউনিয়ন ১৬৭টি চা বাগানের প্রায় ১৫০,০০০ শ্রমিকের প্রতিনিধিত্ব রয়েছে। খ. বলপূর্বক বা বাধ্যতামূলক শ্রমের নিষেধাজ্ঞা এই বিষয়ে স্টেট ডিপার্টমেন্টের মানব পাচার সংক্রান্ত ট্রাফিকিং ইন পারসনস রিপোর্ট লিংকে দেখুন https://www.state.gov/trafficking-in-persons-report/ . গ. শিশুশ্রম নিষিদ্ধ করা এবং (কাজে) নিয়োগের ক্ষেত্রে ন্যূনতম বয়স এই বিষয়ের উপর যুক্তরাষ্ট্রের লেবার ডিপার্টমেন্টের ফাইন্ডিংস অন দি ওরস্ট ফরমস অফ চাইল্ড লেবার প্রতিবেদনটি এখানে দেখুন:
https://www.dol.gov/agencies/ilab/resources/reports/child-labor/findings . ঘ. বৈষম্য (অধ্যায় ৬ দেখুন) ঙ. কাজের গ্রহণযোগ্য শর্ত মজুরি এবং কর্মঘন্টা আইন: জাতীয় নিম্নতম মজুরী বোর্ড খাতভিত্তিক ন্যূনতম মাসিক মজুরি নির্ধারণ করেছে। ন্যূনতম মজুরি মূল্যস্ফীতির সাথে মিল রেখে করা হয়নি, তবে মজুরী বোর্ড মাঝে মাঝে কিছু খাতের মজুরি জীবনযাত্রার ব্যয়ের সাথে মিলিয়ে পুনঃনির্ধারণ করে থাকে। নির্ধারিত ন্যূনতম মজুরির কোনোটিই নগরবাসীর ন্যূনতম জীবনযাত্রার মানের জন্য পর্যাপ্ত নয়, তবে অনেক ক্ষেত্রে নির্ধারিত এই মজুরি দারিদ্র্য সীমার ঊর্ধ্বে ছিল। কোন প্রতিষ্ঠান নির্দিষ্ট ন্যূনতম মজুরি প্রদানে ব্যর্থ হলে এক বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড, জরিমানা বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হতে পারে এবং নিয়োগকারীকে বকেয়া মজুরি পরিশোধ করার বিধান রয়েছে। ন্যূনতম মজুরি বিধানের আওতায় মোট ৪২টি খাত রয়েছে। এই বছর সরকার ন্যূনতম মজুরি বিধানের অধীনে নতুন কোনো শিল্প খাত অন্তর্ভুক্ত করেনি। শ্রম আইনে প্রতি পাঁচ বছর অন্তর ন্যূনতম মজুরি সংশোধনের বিধান থাকলেও অনেক খাতে মজুরি দীর্ঘদিন ধরে অপরিবর্তিত রয়েছে। শক্তিশালী ট্রেড ইউনিয়ন বা শ্রমিক সংগঠন নেই এমন খাতগুলোতে মজুরি বিষয়টি খুব একটা আলোচনায় আসে না বা মনোযোগ পায় না। আইন অনুসারে আদর্শ কর্মদিবস হলো আট ঘণ্টা। আদর্শ কর্মসপ্তাহ ৪৮ ঘন্টা, তবে ওভারটাইম কাজের জন্য মূল মজুরির দ্বিগুণ মজুরি দেয়া সাপেক্ষে কর্মঘণ্টা সপ্তাহে ৬০ ঘণ্টা পর্যন্ত বাড়ানো যেতে পারে। ওভারটাইম কাজ করা বাধ্যতামূলক হবে না। শ্রমিকরা যদি দিনে ছয় ঘণ্টার বেশি কাজ করে তাহলে তাদেরকে অবশ্যই এক ঘণ্টা বিশ্রাম নিতে দিতে হবে এবং যদি দিনে পাঁচ ঘণ্টার বেশি কাজ করে তার জন্য আধা ঘণ্টা বিশ্রাম নিতে দিতে হবে। আইনে বলা হয়েছে যে, প্রত্যেক শ্রমিক বছরে পূর্ণ মজুরিসহ কমপক্ষে ১১ দিনের উৎসব ছুটি পাবে এবং কোন ১১ দিন এই ছুটি হবে সেটা নিয়োগকারী কর্তৃপক্ষ প্রতিষ্ঠানে যদি সিবিএ বা যৌথ দর কষাকষির সংগঠন থাকে তাহলে তাদের সাথে পরামর্শ করে যৌথভাবে নির্ধারিত করবে। কারখানার শ্রমিকদের প্রতি সপ্তাহে একদিন ছুটি পাওয়ার কথা। দোকানের কর্মীরা সপ্তাহে দেড় দিন ছুটি পাবেন। শ্রম আইনে বাধ্যতামূলক ওভারটাইম কাজ করানো কিংবা অধিকাল কাজের মজুরি দিতে ব্যর্থতার জন্য জরিমানার কথা উল্লেখ করেনি। পেশাগত নিরাপত্তা এবং স্বাস্থ্য: আইনে পেশাগত নিরাপত্তা এবং স্বাস্থ্য (ওএসএইচ) মান নির্ধারণ করে দেয়া হয়েছে এবং আইনের সংশোধন করে কারখানা ও প্রতিষ্ঠানে শ্রমিকদের নিরাপত্তা কমিটি তৈরি করা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। শ্রম আইনে এই আইন পালনে ব্যর্থতার কারণে শ্রমিকের ক্ষতির ক্ষেত্রে সুনির্দিষ্ট শাস্তির বিধান রয়েছে। ওএসএইচ আইন লঙ্ঘনের জন্য শাস্তি অপরাধের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল যেমন অবহেলার মতো অপরাধের জন্য শাস্তি। শ্রম আইন বাস্তবায়নের বিধানে কারখানাগুলোতে ওএসএইচ কমিটি গঠনের প্রক্রিয়ার রূপরেখা দেয়া রয়েছে। কমিটিতে ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ এবং যৌথ দরকষাকষি চুক্তির মাধ্যমে মনোনীত শ্রমিক উভয়ই অন্তর্ভুক্ত ছিল কিংবা যেখানে সিবিএ-এর সাথে কোন ধরনের চুক্তি ছিল না সেখানে অংশগ্রহণকারী কমিটির প্রতিনিধিরা অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। যেখানে ইউনিয়ন বা অংশগ্রহণকারী কমিটি কোনটাই ছিল না সেখানে শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় অংশগ্রহণকারী কমিটির নির্বাচন আয়োজনের দায়িত্ব পালন করেছিল। কর্মক্ষেত্রে দুর্ঘটনার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি দুর্ঘটনা ঘটেছে পরিবহন, নির্মাণ, উৎপাদন ও সেবা খাতে। নির্মাণ ও পোশাক খাত শ্রমিকদের জন্য সবচেয়ে বিপজ্জনক ও প্রাণঘাতী ছিল। মে মাসের ৪ তারিখে রহিমা ইন্ডাস্ট্রিয়াল কমপ্লেক্স লিমিটেডে এক বয়লার বিস্ফোরণে সাত শ্রমিক নিহত হন। ফায়ার সার্ভিস সূত্রে জানা যায়, বয়লার চেম্বারে অতিরিক্ত তাপমাত্রার কারণে এই বিস্ফোরণ ঘটেছিল। তদন্তকালে ডিআইএফই ঘটনাস্থলে নিরাপত্তা সরঞ্জামের অনুপস্থিতিসহ বেশ কয়েকটি সুরক্ষা বিষয়ক লঙ্ঘন খুঁজে পেয়েছে। বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ২০২২ সালে ডাইফ এবং পোশাক কারখানার নিরাপত্তার মান তদারকিতে নিয়োজিত বেসরকারি ত্রিপক্ষীয় সংস্থা রেডিমেড গার্মেন্ট সাসটেইনেবিলিটি কাউন্সিল (আরএসসি) এর মধ্যে সম্পাদিত একটি চুক্তি কাঠামো অনুমোদন ও জারি করেছে। এই চুক্তির আওতায় ডাইফ আরএসসি-র সাথে আলোচনা করেছে; এবং নির্ধারিত ফরমে তথ্য ও প্রতিবেদন জমা দিয়েছে; নিরাপত্তার মনিটরিংয়ের জন্য কারিগরি বিষয়াদি নিয়ে আলোচনা করেছে; এবং একটি যৌথ ওয়ার্কিং গ্রুপ গঠন করেছে। বাণিজ্য মন্ত্রণালয় গভর্নমেন্ট কো-অর্ডিনেশন কাউন্সিল এর মাধ্যমে আরএসসি-এর কার্যক্রম তদারকি করেছে। কাউন্সিলে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়, শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়, শিল্প মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষ এবং বেপজা-এর প্রতিনিধিরা অন্তর্ভুক্ত রয়েছেন। বিল্ডিং কোড (ইমারত নির্মাণ বিধিমালা) আন্তর্জাতিক অগ্নি নিরাপত্তার মূল মানগুলো পূরণে ব্যর্থ হয়েছে এবং সরকারের দিক থেকে রপ্তানীমুখী পোশাক খাতের বাইরে থাকা ভবনগুলোর নিরাপত্তায় সীমিত তদারকি ছিল। যদিও ইতোপূর্বে ব্র্যান্ডগুলোর নেতৃত্বাধীন অ্যাকর্ড এবং অনুরূপ কর্মসূচির অধীনে পশ্চিমা ব্র্যান্ডগুলোর জন্য কাজ করে এমন ২,৩০০ তৈরি পোশাক কারখানায় অবকাঠামোগত, অগ্নি এবং বৈদ্যুতিক নিরাপত্তার অবস্থার উন্নয়ন করা হয়েছিল কিন্তু সেফটি অডিটরস (নিরাপত্তা বিষয়ক নিরীক্ষকদের)-এর দেয়া প্রতিবেদন থেকে জানা যায় যে, সঠিকভাবে রক্ষণাবেক্ষণ না করায় এই কারখানাগুলোতে স্থাপিত অগ্নি শনাক্তকরণ এবং দমন ব্যবস্থা প্রায়ই সঠিকভাবে কাজ করে না। সরকারের জাতীয় উদ্যোগের অংশ হিসেবে আরো ১,৫৪৯টি তৈরি পোশাক কারাখানা (আরএমজি)-কে কমপ্লায়েন্ট কারখানা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে যারা অভ্যন্তরীণ বাজারে বিক্রয়ের জন্য কিংবা অন্যান্য বিদেশী বাজারে রপ্তানির জন্য পণ্য উত্পাদন করে থাকে। জাতীয় উদ্যোগের অধীনে নেওয়া কারখানাগুলো মনিটর করা ও প্রতিকারমূলক সহায়তা দিতে সরকার ডাইফ-এর অধীনে একটি প্রতিকার ও সমন্বয় সেল গঠন করেছে। ডাইফ সাতজন প্রকৌশলীর সমন্বয়ে গঠিত একটি শিল্প নিরাপত্তা ইউনিটের মাধ্যমে জাতীয় উদ্যোগের কারখানাগুলোর তত্ত্বাবধান করে থাকে। শিল্প নিরাপত্তা ইউনিট পোশাক খাতের শিল্পের নিরাপত্তার মান মনিটর করা ও প্রতিকারের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে আরএসসি-র সাথে নিবিড়ভাবে কাজ করছে। মজুরি, ঘন্টা এবং ওএসএইচ প্রয়োগ: ডাইফের শ্রম পরিদর্শকরা শুধুমাত্র ইপিজেডের বাইরের প্রতিষ্ঠানে অঘোষিতভাবে পরিদর্শন করার ক্ষমতা রাখেন। ইপিজেডের মধ্যেকার কারখানাগুলো তারা শুধুমাত্র পূর্বঘোষিত সময়ে পরিদর্শন করতে যেতে পারেন, এবং সেগুলো পরিদর্শনের ক্ষেত্রে কিছু সীমাবদ্ধতাও রয়েছে। সরকার ন্যূনতম মজুরি, ওভারটাইম কাজ করা এবং ওএসএইচ আইন কার্যকরভাবে প্রয়োগ করেনি। এই ধরনের আইন লঙ্ঘনের জন্য দেয়া শাস্তি অন্যত্র একই ধরনের অপরাধের শাস্তির সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল না এবং লঙ্ঘনকারীদের বিরুদ্ধে খুব কম ক্ষেত্রেই আইন প্রয়োগ করা হয়েছিল। ডাইফ পরিদর্শকদের জরিমানা করার বা শাস্তিমূলক কোন ব্যবস্থা গ্রহণের ক্ষমতা নেই; তারা লঙ্ঘনের বিষয়গুলো লিখিতভাবে প্রতিষ্ঠানকে জানাতে পারে এবং শ্রম আদালতে অভিযোগ দায়ের করতে পারে। ডাইফ প্রশাসনিক বিধিবিধান লঙ্ঘনের বিষয়ে নিয়োগকারীদের বিরুদ্ধে নিয়মিতভাবে শ্রম আদালতে মামলা দায়ের করে থাকে; যেমন নথিপত্র সংরক্ষণ না করা। শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় তাদের প্রতিবেদনে এই বছর ন্যূনতম মজুরি এবং ওভারটাইম এর বেতন দিতে ব্যর্থতার জন্য ডাইফ কর্তৃক কয়েকটি কারখানার বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করার কথা উল্লেখ করেছে; তবে শ্রমিক সংগঠনগুলো মামলার কোন ঘটনা দেখতে পায়নি। ডাইফ-এ অভিযোগ জানানোর প্রক্রিয়া নিয়ে সমালোচনা রয়েছে। অভিযোগ জানানোর জন্য একজন শ্রমিককে অভিযোগপত্রে তার নাম, পদ ও পরিচিতি নম্বর অবশ্যই উল্লেখ করতে হয়। অভিযোগপত্র পাওয়ার পর ডাইফ থেকে যে কারখানার বিরুদ্ধে অভিযোগ তাদের ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষকে অভিযোগপত্রের সূত্র উল্লেখপূর্বক চিঠি পাঠানো হয়; যেখান থেকে অভিযোগকারীকে শনাক্ত করা যায়। এই প্রক্রিয়ার কারণে শ্রমিকের সুরক্ষা অপর্যাপ্ত হয় এবং এই ব্যবস্থার কার্যকারিতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। বেপজা ইপিজেড-এর শ্রমিকদের জন্য একটি হেল্পলাইন টেলিফোন নম্বর পরিচালনা করে থাকে। পরিদর্শন ও প্রতিকারে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করার ক্ষেত্রে ডাইফের সম্পদ অপর্যাপ্ত ছিল। সারা দেশে ৫৩০,০০০ এরও বেশি উৎপাদন ইউনিট এবং দোকানের নিরাপত্তার বিষয়গুলো দেখার জন্য কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন বিভাগের মাত্র ৪০১ জন পরিদর্শক ও ৩১টি পরিদর্শক কার্যালয় রয়েছে। যদিও গার্মেন্টস শিল্পের উপর মনোযোগ বাড়ানোর ফলে নিরাপত্তার মান উন্নত হয়েছে কিন্তু অন্যান্য খাতে সম্পদ, পরিদর্শন এবং প্রতিকারের ব্যবস্থা অপর্যাপ্ত ছিল। কর্মঘণ্টা সংক্রান্ত আইনগত সীমা নিয়মিতভাবে লঙ্ঘিত হয়েছে এবং শ্রম অধিকার নিয়ে কর্মরত এনজিওদের পর্যবেক্ষণ থেকে দেখা যায় যে, ৯৫ শতাংশ কারখানা ওভারটাইম কর্মঘণ্টার সীমা মেনে চলেনি। নিয়োগকর্তারা প্রায়ই গর্ভবতী নারীসহ শ্রমিকদের দিয়ে দিনে ১২ ঘণ্টার বেশি কাজ করিয়েছেন যাতে কোটা এবং রপ্তানির সময়সীমা ঠিক রাখা যায়। কিন্তু তারা ওভারটাইম কাজের জন্য শ্রমিকদের সবসময় উপযুক্ত মজুরি দেননি। অনেক ক্ষেত্রে নিয়োগকারীরা শ্রমিকদের পাওনা মজুরি বিলম্বে দিয়েছেন কিংবা তাদেরকে পূর্ণ ছুটির সুবিধা দিতে অস্বীকার করেছেন। শ্রম শক্তি জরিপ ২০১৬-২০১৭ থেকে জানা যায় দেশে কর্মে নিয়োজিত মোট ৬ কোটি ১০ লাখ জনসংখ্যার প্রায় ৮৫ শতাংশ অনানুষ্ঠানিক খাতে কাজ করে। অনানুষ্ঠানিক খাতের শ্রমিকদের আইনি সুরক্ষা অপর্যাপ্ত ছিল যদিও বেশিরভাগ পেশাগত দুর্ঘটনা ও স্বাস্থ্যগত ঝুঁকি (ওএসএইচ)-এর ঘটনা অনানুষ্ঠানিক খাতেই ঘটেছে।

ইতিহাস গড়ে বিচারপতি হলেন বাংলাদেশি আমেরিকান সোমা
নিজের মেধা এবং কর্মনিষ্ঠার মাধ্যমে বিচারপতি সোমা একই সঙ্গে বাংলাদেশকেও অনন্য এক উচ্চতায় নিয়ে গেছেন। বাংলাদেশের জাতীয় সংগীতের পর পবিত্র কোরআন ছুঁয়ে নিউইয়র্ক স্টেট সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি হিসেবে শপথ গ্রহণ করেন বাংলাদেশি আমেরিকান সোমা সাঈদ। বীর মুক্তিযোদ্ধা ও সাংবাদিক আফতাবউদ্দিন সাঈদ এবং টাঙ্গাইলের একটি গার্লস হাইস্কুলের প্রধান শিক্ষিকা আমিনা বেগম সাঈদের কন্যা সোমা ১২ বছর বয়সে মা-বাবার সঙ্গে ইমিগ্র্যান্ট হয়ে যুক্তরাষ্ট্রে আসার পর থেকেই নিউইয়র্ক সিটির কুইন্সে বাস করছেন। নিউইয়র্ক সিটির পাবলিক স্কুলে লেখাপড়ার পর সিটি ইউনিভার্সিটি অব নিউইয়র্ক থেকে ব্যাচেলর ডিগ্রি করেন সোমা সাঈদ। এরপর ইউনিয়ন ইউনিভার্সিটির আলবেনি ল’ স্কুল থেকে কৃতিত্বের সঙ্গে জেডি করেছেন। টানা দেড় যুগের অধিক সময় অ্যাটর্নি হিসেবে পেশাগত জীবনযাপনের পাশাপাশি কমিউনিটির নানা কর্মকাণ্ডে জড়িত থেকে সোমা নিজেকে বিশেষ এক অবস্থানে উন্নীত করতে সক্ষম হন। সেই সিঁড়ি বেয়েই ২০২১ সালের নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটিক পার্টির মনোনয়নে কুইন্স কাউন্টিতে নিউইয়র্ক সিটি সিভিল কোর্টের বিচারক হিসেবে বিজয়ী হয়েছিলেন। এর পরের বছর তাঁকে ম্যানহাটনে অবস্থিত নিউইয়র্ক কাউন্টি ক্রিমিনাল কোর্টে বিচারপতির দায়িত্ব প্রদান করা হয় এবং তিনি তা বিচক্ষণতার সঙ্গে ২০২৩ সাল নাগাদ পালন করেছেন। ২০২৪ সালের জানুয়ারি থেকে পুনরায় কুইন্স কাউন্টি সিভিল কোর্টে বিচারপতি হিসেবে কাজ শুরু করেছিলেন। সর্বশেষ গত ৪ নভেম্বরের নির্বাচনে ডেমোক্রেটিক পার্টির মনোনয়নে নিউইয়র্ক স্টেট সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি হিসেবে বিজয়ী হয়েছেন। গত ১৮ ডিসেম্বর তিনি শপথ গ্রহণের মাধ্যমে বিচারপতি হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন।
